নব নব সৃষ্টি
সৈয়দ মুজতবা আলী
নবম শ্রেণি বাংলা
নব নব সৃষ্টি প্রবন্ধের বড় প্রশ্ন উত্তর নবম শ্রেণি বাংলা | Nobo Nobo Sristi Probondher Essay Type Question Answer Class 9 Bengali wbbse
📌নবম শ্রেণি ইউনিট টেস্ট প্রশ্নপত্র Click Here
📌 নবম শ্রেণি বাংলা প্রশ্নোত্তর Click Here
রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর : নব নব সৃষ্টি (সৈয়দ মুজতবা আলী) নবম শ্রেণি বাংলা | Essay Type Question Answer Nobo Nobo Sristi ProbondhoClass 9 Bengali wbbse
• কমবেশি ১৫০ শব্দের মধ্যে উত্তর দাও : প্রতিটি প্রশ্নের মান-৫
১. নব নব সৃষ্টি রচনাংশটিকে কী ধরনের প্রবন্ধ বলা চলে আলোচনা করো।
উত্তরঃ সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধটি একটি তথ্যসমৃদ্ধ, যুক্তিনির্ভর এবং মননশীল ভাষাতাত্ত্বিক প্রবন্ধ। লেখকের ‘চতুরঙ্গ’ গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত এই রচনাটিতে বাংলা ভাষার বিবর্তন, শব্দভাণ্ডারের সমৃদ্ধি এবং সাহিত্যের গতিশীলতা নিয়ে এক পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা করা হয়েছে। একে কেন একটি বিশেষ ধরনের প্রবন্ধ বলা যায়, তা নিচে আলোচনা করা হলো—
ভাষাতাত্ত্বিক ও গবেষণামূলক: প্রবন্ধটির মূল ভিত্তি হলো ভাষা। লেখক এখানে সংস্কৃত, বাংলা, ইংরেজি, আরবি ও ফারসি ভাষার গঠন ও শব্দ গ্রহণের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছেন। সংস্কৃতকে ‘আত্মনির্ভরশীল’ এবং বাংলাকে ‘উদার’ ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি ভাষার অন্তর্নিহিত শক্তিকে ব্যাখ্যা করেছেন।
সংস্কারমুক্ত ও যুক্তিনির্ভর: লেখক কোনো রক্ষণশীল গোঁড়ামিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন যে, ভাষার বিশুদ্ধতা বজায় রাখার নামে বিদেশি শব্দ বর্জন করলে ভাষা তার সজীবতা হারায়। আরবি, ফারসি বা ইংরেজি শব্দ যে বাংলা ভাষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে, তা তিনি অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে তুলে ধরেছেন।
সাংস্কৃতিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট: প্রবন্ধটি কেবল ব্যাকরণগত আলোচনা নয়, বরং বাঙালির জাতীয় চরিত্র ও সংস্কৃতির দর্পণ। বাঙালির বিদ্রোহ করার ক্ষমতা এবং নতুনকে আপন করে নেওয়ার মানসিকতা কীভাবে ভাষাকে প্রভাবিত করে, লেখক তা নিপুণভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।
রম্য ও প্রাঞ্জল উপস্থাপনা: গুরুগম্ভীর বিষয় হওয়া সত্ত্বেও মুজতবা আলীর নিজস্ব সাবলীল গদ্যশৈলী ও রসবোধ প্রবন্ধটিকে রসোত্তীর্ণ করে তুলেছে। জটিল ভাষাতাত্ত্বিক সত্যকে তিনি সাধারণ পাঠকের কাছে অত্যন্ত সহজবোধ্য ও আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করেছেন।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধটি একদিকে যেমন জ্ঞানগর্ভ ও বিশ্লেষণাত্মক, অন্যদিকে এটি আধুনিক মননশীলতার এক অনন্য নিদর্শন। ভাষাকে নদীর মতো প্রবহমান হিসেবে কল্পনা করে লেখক এখানে একটি গতিশীল জীবনদর্শনের পরিচয় দিয়েছেন।
২. “প্রাচীন যুগের সব ভাষাই তাই।”– কোন্ কোন্ ভাষার উল্লেখ করে লেখক কেন এমন মন্তব্য করেছেন ? এ প্রসঙ্গে বর্তমান যুগের কোন্ দুটি ভাষা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন লেখো ? (বই পৃঃ ১৮)
উত্তরঃ প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর রচিত নব নব সৃষ্টি প্রবন্ধের আলোচ্য অংশে সংস্কৃত এবং তার সঙ্গে হিব্রু, গ্রিক, আবেস্তা এবং কিছুটা আধুনিক আরবি ভাষার কথা উল্লেখ করেছেন। প্রাচীন যুগের অধিকাংশ ভাষাই নতুন চিন্তা-ভাবনা, নতুন বিষয় বোঝাতে নতুন শব্দের প্রয়োজন হলে তা নিজ শব্দভাণ্ডারের ধাতু বা শব্দ দ্বারাই তৈরি করার চেষ্টা করেছে। অন্য ভাষা থেকে ঋণ নেওয়ার কথা ভাবে না। বিদেশি শব্দ ব্যবহার করলেও তা অতিসামান্য। তাই লেখক প্রাচীন ভাষাগুলিকে আত্মনির্ভরশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বলেছেন।
ভাষার স্বয়ংসম্পূর্ণতা প্রসঙ্গেই লেখক বর্তমান যুগের ইংরেজি ও বাংলা ভাষার উল্লেখ করেছেন।
অতিরিক্ত শব্দগ্রহণঃ আধুনিক কালের ভাষা ইংরেজি এবং বাংলা অন্যান্য ভাষা থেকে অতিরিক্ত শব্দ গ্রহণ করে নিজের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার ও প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করে।
আরবি-ফারসি শব্দের প্রবেশঃ পাঠান, মোগল যুগে এভাবেই বাংলা ভাষায় প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দ প্রবেশ করেছে এবং স্থানলাভ করেছে। বাংলা পরবর্তীকালে ইংরেজি থেকে এবং ইংরেজির মাধ্যমে অন্যান্য ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করেছে। এই কারণে ইংরেজি ও বাংলা, লেখকের মতে স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষা নয়।
৩. সৈয়দ মুজতবা আলী সংস্কৃত ভাষাকে আত্মনির্ভরশীল বলেছেন কেন বর্তমান যুগে ইংরেজি ও বাংলা ভাষা আত্মনির্ভরশীল নয় কেন ? ২+৩=৫
উত্তরঃ সংস্কৃত ভাষার আত্মনির্ভরশীলতা : লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী সংস্কৃত ভাষাকে ‘आत्मনির্ভরশীল’ বা Self-reliant বলেছেন, কারণ এই ভাষা নতুন কোনো ভাব বা বস্তু প্রকাশের জন্য অন্য কোনো বিদেশি ভাষার কাছে হাত পাতে না। নতুন কোনো শব্দের প্রয়োজন হলে সংস্কৃত তার নিজস্ব ভাণ্ডারে থাকা কোনো প্রাচীন ‘ধাতু’র সঙ্গে উপসর্গ বা প্রত্যয় যোগ করে কিংবা সামান্য অদলবদল ঘটিয়ে নতুন শব্দ তৈরি করে নেয়। এই অভ্যন্তরীণ রূপান্তর ক্ষমতার কারণেই সংস্কৃতকে লেখক একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আত্মনির্ভরশীল ভাষা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বর্তমান যুগে ইংরেজি ও বাংলা ভাষা আত্মনির্ভরশীল নয় হওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো—
শব্দ ঋণ করার প্রবণতা: সংস্কৃতের মতো এই দুটি ভাষা নিজের ধাতুরূপ পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন শব্দ তৈরির চেয়ে অন্য ভাষা থেকে সরাসরি শব্দ ধার করাকে বেশি সহজ মনে করে। ইংরেজি ভাষা বিশ্বব্যাপী প্রসারের ফলে ফরাসি, জার্মান, ল্যাটিন এমনকি ভারতীয় ভাষা থেকেও প্রচুর শব্দ গ্রহণ করেছে।
ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রভাব: বাংলাদেশে দীর্ঘকাল মুসলিম (আরবি-ফারসি) ও ব্রিটিশ (ইংরেজি) শাসনের ফলে এই বিদেশি শব্দগুলো বাংলা ভাষার রক্তে মিশে গেছে। শাসনকার্য, আদালত এবং দৈনন্দিন জীবনে এই শব্দগুলো এতই অপরিহার্য যে, এগুলো বাদ দিলে ভাষা তার প্রকাশক্ষমতা হারাবে।
উদারতা ও বিবর্তন: লেখক মনে করেন, বাংলা ও ইংরেজি অত্যন্ত ‘উদার’ ভাষা। এরা গোঁড়ামি ত্যাগ করে প্রয়োজন অনুযায়ী বিদেশি শব্দকে আপন করে নিয়েছে। এই পরনির্ভরশীলতা বা শব্দ ঋণ করার গুণটিই এই ভাষা দুটিকে আধুনিক বিশ্বে সজীব ও প্রবহমান রেখেছে।
পরিশেষে বলা যায়, নিজস্ব শব্দভাণ্ডার তৈরির ক্ষমতার অভাব এবং অন্য ভাষার প্রতি অতিশয় নির্ভরশীলতাই ইংরেজি ও বাংলাকে অনাত্মনির্ভরশীল করে তুলেছে।
৪. “বর্তমান যুগের ইংরেজি ও বাংলা আত্মনির্ভরশীল নয়”– আত্মনির্ভরশীল ভাষা কাকে বলে ? লেখকের এরকম মনে হওয়ার কারণ কী ? (বই পৃঃ ১৮)
উত্তরঃ আত্মনির্ভরশীল ভাষা– লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর নব নব সৃষ্টি রচনায় বলেছেন যে, ভাষার আত্মনির্ভরশীলতার অর্থ ভাষার স্বয়ংসম্পূর্ণতা। সংস্কৃতকে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়ে তিনি বলেছেন যে এই ভাষায় কোনো নতুন চিন্তা, অনুভূতি, কিংবা বস্তুকে বোঝানোর জন্য শব্দের প্রয়োজন হলে সংস্কৃত তা নিজের ভাণ্ডারেই সন্ধান করে। প্রয়োজনে এমন কোনো ধাতু বা শব্দকে খুঁজে নিতে চায় যা সামান্য অদল-বদল করে বা পুরোনো ধাতুর সাহায্যেই একটি নতুন শব্দ নির্মাণ করে নেওয়া যায়। তাই সংস্কৃত ভাষা একটি আত্মনির্ভরশীল ভাষা হয়ে উঠতে পেরেছে।
লেখকের এরকম মনে হওয়ার কারণ ভাষার স্বয়ংসম্পূর্ণতা প্রসঙ্গেই লেখক বর্তমান যুগের ইংরেজি ও বাংলা ভাষার উল্লেখ করেছেন।
অতিরিক্ত শব্দগ্রহণঃ আধুনিক কালের ভাষা ইংরেজি এবং বাংলা অন্যান্য ভাষা থেকে অতিরিক্ত শব্দ গ্রহণ করে প্রয়োজন মেটানোর এবং নিজের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করে।
আরবি-ফারসি শব্দের স্থানলাভঃ পাঠান, মোগল যুগে এভাবেই বাংলা ভাষায় প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দ স্থানলাভ করেছে। বাংলা পরবর্তীকালে ইংরেজি থেকে এবং ইংরেজির মাধ্যমে অন্যান্য ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করেছে। এই কারণে ইংরেজি ও বাংলা লেখকের মতে স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষা নয়।
৫. বিদেশি শব্দ ব্যবহার বিষয়ে লেখক মুজতবা আলীর ভাবনার পরিচয় দাও।
অথবা, “বিদেশি শব্দ নেওয়া ভালো না মন্দ সে প্রশ্ন অবান্তর।”– কে এমন মনে করেন ? তার এমন মনে হওয়ার কারণ কী লেখো।
অথবা, “বিদেশি শব্দ নেওয়া ভালো না মন্দ সে প্রশ্ন অবান্তর।”– মন্তব্যটির তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও। (বই পৃঃ ১৯)
উত্তরঃ লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর ‘নব নব সৃষ্টি রচনাংশে বর্তমানে বিদেশি শব্দ নেওয়া ভালো না মন্দ সে বিষয়ে প্রশ্ন অবান্তর বলে মনে করেন।
লেখকের মতে, দৈনন্দিন জীবনে আলু-কপি কিংবা বিলিতি ওষুধের মতই আমাদের ভাষাতেও বিদেশি শব্দ থেকে যাবে এবং ভবিষ্যতে তা আমদানি করাও বন্ধ করা যাবে না। প্রাচীন কাল থেকেই বাংলা ভাষায় সংস্কৃত, আরবি, ফারসি প্রভৃতি শব্দ অনায়াসে মিশেছে। ইংরেজি ভাষার বদলে বাংলা ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে চালু করার ফল হাতেনাতে পাওয়া গেছে। কেউ কেউ জোর করে বিদেশি শব্দ বর্জনের চেষ্টা করলেও মুজতবা আলী জানিয়েছেন, বিখ্যাত লেখকেরা অনেকেই সাদরে বিদেশি শব্দ গ্রহণ করেছেন। যেমন রবীন্দ্রনাথ স্বচ্ছন্দে লিখেছেন আবু দিয়ে, ইজ্জৎ দিয়ে, ইমান দিয়ে’… ইত্যাদি। এখানে ‘আব্রু, ইজজৎ’, ইমান’ আরবি শব্দ। আবার নজরুল ইসলামই বাংলায় আরবি শব্দ ইনকিলাব ঢুকিয়ে গিয়েছেন। বিদ্যাসাগর সাধু গদ্যে বিদেশি শব্দ ব্যবহার না করলেও, অসাধু রচনায় আরবি, ফারসি প্রচুর ব্যবহার করেছেন। নিষ্ঠাবান পণ্ডিত হলেও হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বিদেশি শব্দ বিশেষত আরবি-ফারসির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করাকে বোকামি মনে করতেন। এমনকি হিন্দি সাহিত্যে প্রেমচন্দ্রও বিস্তর আরবি-ফারসি ভাষা ব্যবহার করেছেন। এইসব দৃষ্টান্ত দিয়ে প্রাবন্ধিক বুঝিয়ে দিয়েছেন বিদেশি শব্দের ব্যবহার নিয়ে বর্তমানে প্রশ্ন তোলাই অবান্তর।
৬. “চেষ্টাটার ফল আমি হয়তো দেখে যেতে পারবো না।”- উদ্ধৃতিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ কর। ৫
উত্তরঃ সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধে বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দের ব্যবহার এবং ভাষার শুদ্ধতা নিয়ে যে আলোচনা করেছেন, প্রশ্নেল্লিখিত উদ্ধৃতিটি সেই প্রসঙ্গেরই অংশ। নিচে এর তাৎপর্য বিশ্লেষণ করা হলো—
প্রেক্ষাপট ও প্রচেষ্টা: বিংশ শতাব্দীতে বাংলা ভাষা থেকে আরবি, ফারসি ও ইংরেজি শব্দ ছেঁটে ফেলে ভাষাকে ‘বিশুদ্ধ’ করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। লেখক এই রক্ষণশীল মানসিকতার বিপরীতে দাঁড়িয়েছেন। তিনি মনে করেন, বাংলা ভাষা অত্যন্ত উদার এবং ঐতিহাসিক কারণেই বহু বিদেশি শব্দ এর অঙ্গীভূত হয়ে গেছে। লেখকের ‘চেষ্টা’ বলতে এখানে বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দের সার্থক ও স্বাভাবিক প্রয়োগের মাধ্যমে ভাষাকে সমৃদ্ধ করার আন্দোলনকে বোঝানো হয়েছে।
তাৎপর্য ও দূরদর্শিতা—
ভাষার প্রবহমানতা: লেখক বিশ্বাস করতেন, জোর করে কোনো জীবন্ত ভাষা থেকে প্রচলিত শব্দ বাদ দেওয়া যায় না। তিনি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বা বিদ্যাসাগরের উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন যে, তাঁরা সাহসের সঙ্গে বিদেশি শব্দ ব্যবহার করে ভাষাকে নতুন রূপ দিয়েছেন।
ফলাফল নিয়ে সংশয়: কোনো ভাষার বিবর্তন বা সংস্কার রাতারাতি ঘটে না; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। লেখক জানতেন যে, গোঁড়ামি ত্যাগ করে সর্বস্তরের মানুষ কবে নাগাদ বিদেশি শব্দকে পুরোপুরি আপন করে নেবে বা এর সার্থক রূপায়ন ঘটবে, তা তাঁর জীবদ্দশায় দেখে যাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।
বাঙালির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য: বাঙালির বিদ্রোহী সত্তা যেমন নতুন কিছু সৃষ্টি করতে চায়, তেমনি রক্ষণশীল সমাজ অনেক সময় তাতে বাধা দেয়। এই দ্বান্দ্বিক অবস্থানের কারণে লেখক তাঁর এই আধুনিক ভাষাচিন্তার পূর্ণ প্রতিফলন দেখে যাওয়ার ব্যাপারে অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেছেন।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, উদ্ধৃতিটির মাধ্যমে লেখকের বিনয় এবং একইসঙ্গে এক সুদূরপ্রসারী সত্য প্রকাশিত হয়েছে। তিনি জানতেন, ‘নব নব সৃষ্টি’র মাধ্যমে বাংলা ভাষা একদিন বিশ্বজনীন হয়ে উঠবে, তবে সেই বিবর্তনের চূড়ান্ত রূপ দেখার জন্য সময়ের প্রয়োজন।
৭. “ইংরেজি চর্চা বন্ধ করার সময় এখনও আসেনি।”– বক্তা কে ? এরূপ উক্তির কারণ কী ?
উত্তরঃ প্রশ্নোদ্ধৃত অংশটির বক্তা হলেন ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধের লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী।
লেখকের মতে বাংলা ভাষা আত্মনির্ভরশীল ভাষা নয়। আরবি-ফারসির মতোই ইংরেজির থেকেও আমরা প্রচুর শব্দ নিয়েছি। ভাষাকে স্বাবলম্বী করে তোলার জন্য অন্য ভাষাকে ত্যাগ করার চেষ্টা একেবারে বিরল ঘটনা নয়। হিন্দিতে এ চেষ্টা হয়েছে। আবার বিখ্যাত লেখকদেরও দেখা গিয়েছে যে, তাঁরা অন্য পথে হেঁটেছেন। বাংলা ভাষাতেই রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এর উদাহরণ। লেখক দেখিয়েছেন যে বাংলা ভাষায় যে শব্দসমূহ এসেছে তার মধ্যে আরবি, ফারসি এবং ইংরেজি প্রধান। এক্ষেত্রে ইংরেজির ভূমিকা কোনোভাবেই এড়ানো সম্ভব নয়। প্রয়োজনীয় বাংলা শব্দের অভাব– দর্শন, নন্দনশাস্ত্র, পদার্থ কিংবা রসায়নবিদ্যা ইত্যাদির জন্য প্রয়োজনীয় শব্দ বাংলায় যথেষ্ট নেই। রেল ইঞ্জিন চালানোর প্রযুক্তি বিষয়ে বাংলায় কোনো বই নেই। এখানে ইংরেজির উপরে নির্ভর করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। এইসব কারণেই লেখকের মনে হয়েছে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার জন্য ইংরেজির চর্চা বন্ধ করার সময় এখনও আসেনি।
৮. বাংলায় সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষার চর্চা এখনো প্রয়োজন বলে লেখক কেন মনে করেন ? ৫
উত্তরঃ সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধে বাংলা ভাষার সজীবতা ও মৌলিকত্ব রক্ষার স্বার্থে সংস্কৃত ও ইংরেজি— উভয় ভাষার চর্চাকেই অপরিহার্য মনে করেছেন। এর কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো—
সংস্কৃত ভাষার প্রয়োজনীয়তা—
ঐতিহাসিক ভিত্তি: বাংলা ভাষার মূল উৎস বা জননী হলো সংস্কৃত। বাংলা শব্দভাণ্ডারের একটি বিশাল অংশ (তৎসম ও তদ্ভব শব্দ) সংস্কৃত থেকে এসেছে। তাই শেকড়ের টান এবং ভাষার অভ্যন্তরীণ গঠন বুঝতে সংস্কৃত চর্চা জরুরি।
নতুন শব্দ সৃষ্টি: সংস্কৃত একটি ‘আত্মনির্ভরশীল’ ভাষা। কোনো নতুন ভাব প্রকাশের জন্য বাংলার নিজস্ব ভাণ্ডারে টান পড়লে সংস্কৃতের ধাতু ও ব্যাকরণ অনুসরণ করেই নতুন শব্দ তৈরি করা সম্ভব হয়।
ইংরেজি ভাষার প্রয়োজনীয়তা—
আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান: বর্তমান যুগে বিজ্ঞান, দর্শন ও প্রযুক্তির নব নব আবিষ্কারের সিংহভাগই ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে আমাদের কাছে পৌঁছায়। পাশ্চাত্য শিক্ষার এই সম্পদ আহরণের জন্য ইংরেজি চর্চা আবশ্যিক।
ভাষার গতিশীলতা: ইংরেজি অত্যন্ত উদার ভাষা। এই ভাষার সংস্পর্শে এসে বাংলা ভাষা তার আড়ষ্টতা কাটিয়ে আধুনিক ও সাবলীল হয়েছে। লেখক দেখিয়েছেন, ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালিরাই বাংলা সাহিত্যে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছেন।
উপসংহার: লেখক মনে করেন, সংস্কৃত আমাদের ঐতিহ্যকে ধরে রাখে আর ইংরেজি আমাদের আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করে। এই দুই ভাষার চর্চা বন্ধ করলে বাংলা ভাষা কেবল শব্দভাণ্ডারে দরিদ্র হবে না, বরং তার উন্নতির পথও রুদ্ধ হয়ে যাবে। তাই বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করতে এই দুই ভাষার চর্চা সমান্তরালভাবে প্রয়োজন।
৯. ধর্ম বদলালেই জাতির চরিত্র বদলায় না।’– উৎস ও প্রসঙ্গ নির্দেশ করে উদ্ধৃতির তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও।
অথবা, “ধর্ম বদলালেই জাতির চরিত্র বদলায় না।”– নব নব সৃষ্টি রচনা অবলম্বনে এই উক্তির সত্যতা বিচার করো।
উত্তরঃ আলোচ্য উদ্ধৃতিটি প্রখ্যাত প্রবন্ধকার সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধ থেকে গৃহীত। নব নব সৃষ্টি প্রবন্ধের শেষে সৈয়দ মুজতবা আলী বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যসৃষ্টি ও বাঙালি চরিত্রের বিদ্রোহ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। রাজনীতি, ধর্ম, সাহিত্য– বাঙালি যেখানে যখনই সত্য-শিব-সুন্দরের খোঁজ পেয়েছে তখনই তা সাদরে গ্রহণ করতে চেয়েছে।
কেউ গতানুগতিকতা বা প্রাচীন ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে তাতে বাধা দিতে গেলে বাঙালি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। আবার সেই বিদ্রোহই যদি উচ্ছৃঙ্খলতা বা নৈরাজ্যের দিকে যায় তখন বাঙালি তার বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ করেছে। অর্থাৎ সত্য-শিব-সুন্দরের ধারণাকে বাঙালি চিরন্তন বলে গ্রহণ করেছে।
লেখক লক্ষ করেছেন যে এই রুচি বা জীবনাদর্শকে প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে হিন্দু বা মুসলমানদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আর এই বিদ্রোহে বাঙালি মুসলমানরাও যোগ দিয়েছে। তার কারণ জাতি, ধর্ম বদলে গেলেও জাতিসত্তা একই থেকে যায়। এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটি সমগ্র বাঙালি জাতিরই, কোনো বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নয়। লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছেন, ধর্ম বদলালে জাতির চরিত্র বদলায় না। বাঙালি মুসলমানরাও বাঙালি জাতিসত্তারই অংশ। তার ধর্ম আলাদা হলেও এদেশের জল হাওয়াতেই তার চেতনা ও জীবনাদর্শের বিকাশ। তাই ধর্ম বদলে গেলেও মনোভাবের কোনো বদল বাঙালি মুসলমানের মধ্যে ঘটেনি।
১০. বাংলায় আরবি ফার্সি শব্দের ব্যবহার ও তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে লেখকের ভাবনার পরিচয় দাও। ৫
উত্তরঃ সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধে বাংলা ভাষায় আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার ও এর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি বাস্তববাদী ও যুক্তিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন।
আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহারের প্রেক্ষাপট:
লেখকের মতে, পাঠান-মোগল শাসনের দীর্ঘ কয়েকশ বছর ফারসি ছিল ভারতের রাজভাষা। এই সুদীর্ঘ সময়ে শাসনকার্য, আইন-আদালত, খাজনা-খারিজ এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে আরবি ও ফারসি শব্দগুলো বাংলা ভাষার রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমনভাবে মিশে গেছে যে, সেগুলোকে আজ আর ‘বিদেশি’ বলে পৃথক করা সম্ভব নয়। এমনকি বিদ্যাসাগরের মতো সংস্কৃত পণ্ডিতও তাঁর রসাত্মক রচনায় এই শব্দগুলো সার্থকভাবে ব্যবহার করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সাহিত্যেও এই শব্দগুলোর সাবলীল উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
ভবিষ্যৎ সম্পর্কে লেখকের ভাবনা—
বর্জন অসম্ভব: লেখক মনে করেন, কিছু অতি-রক্ষণশীল ব্যক্তি বা ভাষাতাত্ত্বিকরা চাইলেও বাংলা ভাষা থেকে আরবি-ফারসি শব্দ সম্পূর্ণ বর্জন করা অসম্ভব। বিশেষ করে আইন-আদালত এবং ধর্মের পরিভাষা থেকে এই শব্দগুলো সরিয়ে দিলে বাংলা ভাষা তার প্রকাশক্ষমতা হারাবে।
স্বাভাবিক প্রস্থান: লেখক বিশ্বাস করেন, যদি কোনো শব্দ ভাষাতে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে, তবে তা সময়ের নিয়মে নিজে থেকেই হারিয়ে যাবে। কৃত্রিমভাবে বা জোর করে কোনো শব্দকে তাড়ানো উচিত নয়।
নতুনের আগমন: বাঙালির চরিত্রে যেমন বিদ্রোহ আছে, তেমনি নতুনকে গ্রহণ করার ক্ষমতাও আছে। তাই ভবিষ্যতে হয়তো আরবি-ফারসি শব্দের সংখ্যা কমতে পারে, কিন্তু একেবারে নির্মূল হবে না।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, লেখক বাংলা ভাষাকে একটি প্রবহমান নদীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, ভাষার সজীবতা রক্ষার তাগিদে আরবি-ফারসি শব্দগুলো বাংলার নিজস্ব সম্পদ হিসেবেই টিকে থাকবে।
১১. “ফল যদি ভালো হয় তখন তাঁরা না হয় চেষ্টা করে দেখবেন।”— কোন্ প্রসঙ্গে লেখক এরূপ বলেছেন ? বাংলা সাহিত্যিকদের নিয়ে এই প্রসঙ্গে লেখক কী বলেছেন ?
উত্তরঃ সৈয়দ মুজতবা আলী ‘নব নব সৃষ্টি প্রবন্ধে’ ভাষায় বিদেশি শব্দের ব্যবহার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে হিন্দি ভাষার সাহিত্যিকদের একটি প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরেছেন। হিন্দি ভাষাকে আরবি, ফারসি, ইংরেজি শব্দ থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্য নিয়ে হিন্দি সাহিত্য রচনায় ব্রতী হয়েছেন বেশ কিছু হিন্দি সাহিত্যিক। তাঁদের এই চেষ্টার ফল ভালো না খারাপ হবে, তা বিচার করার চেয়েও বড়ো কথা হল এই যে তাঁরা এই জাতীয় একটি চেষ্টা শুরু করেছেন।
বাংলা সাহিত্যিকদের নিয়ে লেখকের অভিমত হলো বাংলা সাহিত্যিকরা অনায়াসেই বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। নতুন নতুন সাহিত্য সৃষ্টি করতে হলে ভাষা বিষয়বস্তুকেন্দ্রিক হবে এটাই মূল কথা। তাই রবীন্দ্রনাথ খুব স্বচ্ছন্দেই আরবি-ফারসি ভাষার সংমিশ্রণে লিখেছেন, আব্রু দিয়ে, ইজ্জৎ দিয়ে, ইমান দিয়ে, বুকের রক্ত দিয়ে। নজরুল ইসলামও ইনকিলাব বা শহিদ এই শব্দগুলি সহজেই তাঁর লেখায় বাংলা ভাষার মধ্যে মিশিয়ে দিয়েছেন। বিদ্যাসাগরও তাঁর চলিত ভাষায় লেখা রচনার মধ্যে আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার করেছেন। পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আরবি-ফারসি শব্দের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করাকে মূর্খামি বলে মনে করতেন।
১২. “বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্য সৃষ্টি তার পদাবলী কীর্তনে।”- উদ্ধৃতাংশটির মাধ্যমে প্রাবন্ধিকের কোন মনোভাব ফুটে উঠেছে লেখ। ৫
উত্তরঃ সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধে বাঙালির বিচিত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং তার সাহিত্যিক নিদর্শনের আলোচনায় উপরোক্ত মন্তব্যটি করেছেন। এই উদ্ধৃতিটির মাধ্যমে প্রাবন্ধিকের যে গভীর ও বিশ্লেষণাত্মক মনোভাব ফুটে উঠেছে—
মৌলিকত্বের প্রশংসা: লেখক মনে করেন, বাঙালির চরিত্রে যেমন বিদ্রোহ এবং নতুনকে গ্রহণ করার প্রবণতা রয়েছে, ঠিক তেমনি সৃজনশীলতার ক্ষেত্রেও বাঙালি অনন্য। ‘পদাবলী কীর্তন’ বাঙালির নিজস্ব সম্পদ। এটি সংস্কৃত সাহিত্যের অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং বাঙালির হৃদয়ের আবেগ ও মাধুর্য দিয়ে তৈরি এক মৌলিক সৃষ্টি।
সমন্বিত সংস্কৃতির পরিচয়: পদাবলী কীর্তনে হিন্দু-মুসলমান উভয় সংস্কৃতির এক অপূর্ব সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়। বাঙালির এই ‘মিলিমিশে যাওয়া’ বা সংকর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই যে তার সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে, লেখক সেই সত্যটিই এখানে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন।
বিদ্রোহ ও নবসৃষ্টি: বাঙালি যখনই গতানুগতিক প্রথা বা অনুকরণ প্রিয়তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, তখনই মহৎ কিছু সৃষ্টি হয়েছে। পদাবলী কীর্তন সেই বিদ্রোহেরই ফল, যেখানে আড়ষ্টতা ত্যাগ করে লৌকিক জীবনের প্রেম ও ভক্তি এক নতুন রূপ পেয়েছে। লেখকের মতে, এই ‘নব নব সৃষ্টি’র ক্ষমতার কারণেই পদাবলী কীর্তন বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক নিদর্শন।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, প্রাবন্ধিক এই মন্তব্যের মাধ্যমে বাঙালির সৃজনশীল প্রতিভা এবং তার স্বকীয়তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, অনুকরণ নয়, বরং নিজস্ব সংস্কৃতি ও আবেগের সংমিশ্রণেই একটি জাতি তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি উপহার দিতে পারে।
১৩. “রচনার ভাষা তার বিষয়বস্তুর উপর নির্ভর করে।”– মন্তব্যটির তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও।
উত্তরঃ উদ্ধৃতাংশটি সৈয়দ মুজতবা আলীর নব নব সৃষ্টি পাঠ্য প্রবন্ধ থেকে নেওয়া। রচনার গাম্ভীর্য, আভিজাত্য, চটুলতার সঙ্গে ভাষার ব্যবহার গভীরভাবে জড়িত।
বিদেশি ভাষার প্রয়োজনীয়তা – নতুন শব্দ তৈরি বা বিষয়ের মধ্য দিয়ে নতুন চিন্তা ও অনুভূতি ফুটিয়ে তুলতে গেলে বিদেশি ভাষার প্রয়োজন। শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ভাষা বাতিল করার ফলে বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দ আরও বেশি করেই প্রবেশ করেছে। তবে বিদেশি শব্দ কোনোভাবেই লেখার মাধুর্যকে নষ্ট করতে পারে না যদি তা বিষয়কেন্দ্রিক হয়। বিভিন্ন ভাষার ব্যবহার – রবীন্দ্রনাথ আরবি-ফারসিকে স্বাগত জানিয়ে খুব স্বচ্ছন্দেই লিখেছেন, আব্রু দিয়ে, ইজ্জৎ দিয়ে, ইমান দিয়ে, বুকের রক্ত দিয়ে। নজরুল ইসলামও ইনকিলাব, শহিদ, প্রভৃতি শব্দ বাংলায় অনায়াসেই ব্যবহার করেছেন। শংকরদর্শন-এর আলোচনায় যে গাম্ভীর্য ও আভিজাত্য রয়েছে, তা সংস্কৃত শব্দ ব্যবহারেই সঠিক রূপ লাভ করে।
বসুমতী পত্রিকার সম্পাদকীয় ভাষাও একইরকম গম্ভীর প্রকৃতির। কিন্তু বাঁকা চোখে পত্রিকার ভাষায় চটুলতা তার বিষয় উপযোগী। আবার রেলের ইঞ্জিন কীভাবে চালাতে হয় বা বিজ্ঞানচর্চা ও দর্শনের বিষয় জানতে ইংরেজি ভাষার বিকল্প নেই। ইতিকথা – সুতরাং সঠিক ভাষা প্রয়োগ বিষয়বস্তুর মূলভাবকে তুলে ধরতে পারে।
১৪. বাংলায় যেসব বিদেশি ভাষার শব্দ ঢুকেছে তার মধ্যে কোন্ কোন্ ভাষাকে লেখক প্রধান বলেছেন ? এই প্রসঙ্গে সংস্কৃত ও ইংরেজি নিয়ে লেখক কী বলেছেন ?
অথবা, বাংলা ভাষায় আগন্তুক শব্দ কোন্গুলি ? প্রসঙ্গক্রমে সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষা নিয়ে লেখকের বক্তব্য স্পষ্ট করো।
উত্তরঃ লেখকের মতে বাংলায় আগত প্রধান বিদেশি ভাষাসমূহ – সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর নব নব সৃষ্টি রচনাংশে জানিয়েছেন যে বাংলায় যেসব বিদেশি শব্দ প্রবেশ করেছে সেগুলির মধ্যে আরবি, ফারসি ও ইংরেজি ভাষার শব্দই প্রধান
সংস্কৃত ও ইংরেজি সম্বন্ধে লেখকের অভিমত হলো একসময়ে ভারতবর্ষ তথা বাংলাদেশে সংস্কৃত ভাষার ব্যাপক চর্চা ছিল। কারণ সংস্কৃতই ছিল আদি ও মূল ভাষা। এখনও স্কুল-কলেজে সংস্কৃতচর্চা হয়। সংস্কৃত থেকে উৎপন্ন হওয়ার ফলে বাংলা ভাষায় সংস্কৃত ভাষার প্রভাব থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। সংস্কৃত শব্দ এখনও সামান্য হলেও বাংলা ভাষায় প্রবেশ করছে। সংস্কৃত ভাষাকে বাংলার মাতৃসম ভাষাই বলা হয়, তাই সংস্কৃতচর্চা বন্ধ করে দিলে বাংলা ভাষা এক স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন হবে। তাই লেখক এ প্রসঙ্গে বলেছেন, আমরা অন্যতম প্রধান খাদ্য থেকে বঞ্চিত হবো।
আধুনিক শিক্ষার ধারায় দর্শনশাস্ত্র, নন্দনশাস্ত্র, পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা এবং বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষার বিকল্প নেই। উদাহরণ হিসেবে লেখক বলেছেন যে রেলের ইঞ্জিন কী করে চালাতে হয়, সে বিষয়ে বাংলায় কোনো বই নেই। ফলে এই বিষয়টা বুঝতে হলে বাঙালিকে ইংরেজি ভাষারই আশ্রয় নিতে হয়। সুতরাং ইংরেজি চর্চা বন্ধ করার সময় এখনও আসেনি। — এ কথা বলাই যায়।
◆ নব নব সৃষ্টি প্রবন্ধের বিষয়বস্তু
◆ MCQ প্রশ্নোত্তর (প্রতিটি প্রশ্নের মান ১)
◆ VSAQ প্রশ্নোত্তর (প্রতিটি প্রশ্নের মান ১)
◆ সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (প্রতিটি প্রশ্নের মান ৩)
📌 আরো দেখুনঃ
📌নবম শ্রেণি ইউনিট টেস্ট প্রশ্নপত্র Click Here
📌 নবম শ্রেণি বাংলা প্রশ্নোত্তর Click Here
