আকাশে সাতটি তারা কবিতার বড় প্রশ্ন উত্তর নবম শ্রেণি বাংলা | Akashe Satti Tara Kobitar Essay Type Question Answer Class 9 Bengali wbbse

আকাশে সাতটি তারা
জীবনানন্দ দাশ
নবম শ্রেণি বাংলা (প্রথম ভাষা)

আকাশে সাতটি তারা কবিতার বড় প্রশ্ন উত্তর নবম শ্রেণি বাংলা | Akashe Satti Tara Kobitar Essay Type Question Answer Class 9 Bengali wbbse

📌নবম শ্রেণি ইউনিট টেস্ট প্রশ্নপত্র Click Here

📌 নবম শ্রেণি বাংলা প্রশ্নোত্তর Click Here

রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর আকাশে সাতটি তারা (জীবনানন্দ দাশ) নবম শ্রেণি বাংলা | Akashe Satti Tara Essay Type Question Answer Class 9 Bengali wbbse

• কমবেশি ১৫০ শব্দের মধ্যে উত্তর দাও : প্রতিটি প্রশ্নের মান- ৫

১. “আকাশে সাতটি তারা” কবিতায় কবির দেখা বাংলার রূপ নিজের ভাষায় বর্ণনা করো।

উত্তরঃ প্রকৃতিপ্রেমী কবি জীবনানন্দ তাঁর “আকাশে সাতটি তারা” কবিতায় রূপসী বাংলার সন্ধ্যাবেলার সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছেন।

ঠিক যখন সূর্য অস্ত যায় তখনকার মেঘ কামরাঙ্গা ফলের মতো লাল হয়ে ওঠে। আবার কিছুক্ষণ পরে সেই মেঘ ধীরে ধীরে দিগন্তরেখায় বিলীন হয়ে যায় এবং আকাশে সাতটি তারা ফুটে ওঠে। এখানে কবি যে সাতটি তারার কথা বলেছে তা আসলে সপ্তর্ষিমণ্ডল। দিনরাত্রির এই সন্ধিক্ষণে সৃষ্ট সান্ধ্যকালীন সৌন্দর্য পৃথিবী আর অন্য কোথাও দেখা যায় না। কবি অনুভব করেন সূর্য অস্ত যাওয়ার পর আকাশে এক এলোকেশী কন্যার দেখা মেলে। সেই মেয়েটির ছড়িয়ে পড়া কালো চুলের মতই সন্ধ্যার আকাশে ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসে। আর সেই অন্ধকার যখন হিজল কাঁঠাল জাম ইত্যাদি গাছের পাতা ছুঁয়ে নেমে আসে তখন যেন মনে হয় তা রূপসীর চুলের সোহাগ চুম্বন।

কবি প্রকৃতিকে গন্ধ, বর্ণ ও স্পর্শের দ্বারা অনুভব করেন। আর তাই বাংলার সন্ধ্যার রূপকে তিনি শুধুমাত্র চোখেই দেখেননি গন্ধেও তা অনুভব করেছেন। ধান গাছ, কাঁঠাল গাছ, কলমি শাক, মুথা ঘাস, ভেজা হাঁসের পালক – সবকিছুর গন্ধ মিলেই বাংলার গন্ধ তৈরি হয়। কবি এই ভাবেই তাঁর রূপসী বাংলাকে খুঁজে পেয়েছিলেন।

২. ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় প্রকাশিত কবি জীবনানন্দের বঙ্গপ্রকৃতি– প্রীতির পরিচয় দাও।

উত্তরঃ কবি জীবনানন্দ দাশের বঙ্গপ্রকৃতি- প্রীতির শ্রেষ্ঠ পরিচয় হল রূপময়ী বাংলার প্রকৃতি জগতের অপার সৌন্দর্য নিয়ে লেখা কাব্যগ্রন্থ ‘রূপসী বাংলা’। এই বইয়ের প্রতিটি কবিতার মধ্যে বঙ্গপ্রকৃতির নানা শোভা, নানা বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্য যেন হাজার ছবি হয়ে ফুটে আছে। ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতা সেগুলির মধ্যে একটি। বাংলার বুকে নেমে আসা সন্ধ্যার দৃশ্য কবি কেবল দু-চোখ ভরে দেখেননি। তাঁর দৃষ্টিতে ঘনায়মান সন্ধ্যা যেন কেশবতী কন্যা। সে রূপসীর এলো চুল কেবল কবির চোখ ও মুখের ওপর ভাসমান নয়, তার চুলের চুমা অবিরত ঝরে হিজলে, কাঁঠালে, জামে। সন্ধ্যার এই দৃশ্য বাংলা ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না বলে কবি মনে করেন। ‘পৃথিবীর কোন পথ এ কন্যারে দেখে নি কো—’। হিজল কাঁঠাল জাম নিয়ে বাংলা প্রকৃতির যে গাছ-গাছালি তা বাংলার নিজস্ব প্রকৃতি জগৎ। ওই বঙ্গপ্রকৃতির আরও নিজস্ব অনুষঙ্গ হল নরম ধান, কলমি লতা, হাঁস, শর, পুকুরের জল, চাঁদা-সরপুঁটি, বটের লাল লাল ফল। ওইসব অনুষঙ্গের নিজস্ব ঘ্রাণ যেন রূপসী বঙ্গসন্ধ্যা কেশবতী কন্যার চুলের বিন্যাস থেকে ঝরে পড়া স্নিগ্ধ গন্ধ। কবি জীবনানন্দ তাঁর গভীর ভালোবাসা ও মমত্ব দিয়ে বাংলার সমাগত সন্ধ্যার সৌন্দর্য বর্ণনার অবকাশে তাঁর বঙ্গপ্রকৃতির পরিচয়কে সার্থক করে রেখেছেন।

৩. ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

উত্তরঃ যে-কোনো কবিতার নামকরণ তার বিষয়ের গভীর অর্থকে প্রকাশ করে। কখনও তা হয় রূপকধর্মী আবার কখনো তা হয় ব্যঞ্জনাধর্মী। কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থের কোনো কবিতার নামকরণ করেননি। শ্রদ্ধেয় সংকলকগণ এই নামকরণ করেছেন। আমাদের আলোচ্য বিষয় ‘আকাশে সাতটি তারা’ নামকরণের সার্থকতা কতখানি বজায় আছে।

কবি এই কবিতায় প্রকৃতি চেতনার গভীরে ডুব দিয়েছেন। ঘাসের উপর বসে সন্ধ্যা সমাগমকে লক্ষ্য করেছেন। আকাশে যখন প্রথমবার সাতটি তারা ফুটে উঠেছে, কবি সন্ধ্যার আগমনকে বুঝতে পেরেছেন। সূর্যাস্ত পরবর্তী আকাশের কামরাঙা লাল মেঘ, তাঁকে মনে করিয়েছে মৃত মনিয়া বা গঙ্গা সাগরের জলের অতলে ডুবে যাওয়া বিসর্জিত কন্যাকে। পল্লীগ্রামে শান্ত-অনুগত নীল সন্ধ্যা নেমে আসে। এই চঞ্চলতা হীন, ধীর অথচ সপ্রতিভ অন্ধকার কবিমনে কেশবতী কন্যার চুলের কল্পনা ফুটে ওঠে। তাঁর চোখের উপর, মুখের উপর নেমে আসে অন্ধকার, কবি অনুভব করেন বাংলার অতি পরিচিত হিজল- কাঁঠাল-জাম গাছ সেই কেশবতী কল্পিত কন্যার চুলের স্পর্শে আচ্ছাদিত হয়। সন্ধ্যার স্নিগ্ধ গন্ধে কবি ডুব দেন। কবি নূতন করে খুঁজে পান গ্রাম বাংলার সাধারণ অথচ অসাধারণ গন্ধকে। কিশোরীর ভিজে হাত, কিশোরের পায়ে দলা মুথাঘাস, লাল লাল বটের ফলে ব্যথিত গন্ধের ক্লান্ত নীরবতা কবিকে পল্লী বাংলার সৌন্দর্যে অভিভূত করে। কবি বাংলার প্রাণকে খুঁজে পান। যখন ‘আকাশে সাতটি তারা’র ঔজ্জ্বল্য, নীল সন্ধ্যায় জেগে থাকে, কবি তা টের পান।

এই কবিতায় ‘আকাশে সাতটি তারা’ শব্দবন্ধ কবি দুই বার ব্যবহার করেছেন। সাতটি তারার প্রথম ফুটে ওঠা (যা সন্ধ্যার সূত্রপাত) এবং উজ্জ্বলভাবে জেগে থাকার (সন্ধ্যা শেষে রাত্রির আগমন) মধ্যে দিয়ে সম্ভবত কবি সন্ধ্যার সময়টুকু বোঝাতে চেয়েছেন।

এই কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে এই কবিতাটির মাধ্যে দিয়ে গ্রাম বাংলার সান্ধ্যকালীন স্নিগ্ধরূপ কবি ফুটিয়ে তুলেছেন। তাই বলা যায়, আকাশে সাতটি তারা নাম এই কবিতার জন্য একেবারেই যথার্থ।

৪. আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় বাংলার সান্ধ্য প্রকৃতির যে রূপচ্ছবি ফুটে উঠেছে তা নিজের ভাষায় আলোচনা করো। ৫

উত্তরঃ জীবনানন্দ দাশের ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতাটি রূপসী বাংলার এক মায়াবী এবং নিবিড় সন্ধ্যার চিত্রপট। কবি যখন ঘাসের ওপর বসে আকাশের সপ্তর্ষিমণ্ডল বা সাতটি তারা ফুটে উঠতে দেখেন, তখন তাঁর চোখের সামনে বাংলার শান্ত ও অনুগত এক অপরূপ সন্ধ্যারূপ উন্মোচিত হয়।

কবি সন্ধ্যার আকাশকে কল্পনা করেছেন ‘পাকা কামরাঙা’ ফলের মতো লাল মেঘের আবহে, যা গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে কোনো এক মৃত মনিয়া পাখির মতো তলিয়ে যায়। এরপরই নেমে আসে এক শান্ত, স্নিগ্ধ নীল সন্ধ্যা। এই সন্ধ্যাকে কবি এক ‘কেশবতী কন্যা’-র রূপক হিসেবে দেখেছেন। সেই রূপসীর ছড়িয়ে পড়া কালো চুলের অন্ধকার রাশি যেন হিজল, জাম আর কাঁঠাল বনে অজস্র চুম্বনের মতো ঝরে পড়ে। পৃথিবীর অন্য কোনো পথে প্রকৃতির এমন মায়াবী রূপ দেখা যায় না।

কবির এই নিসর্গ বর্ণনায় কেবল দৃশ্য নয়, বরং ঘ্রাণ ও স্পর্শের এক অনন্য মেলবন্ধন ঘটেছে। নরম ধান, কলমী শাক, হাঁসের পালক, শর আর সরপুঁটি মাছের মৃদু আঁশটে গন্ধের মধ্যেই কবি বাংলার প্রাণকে খুঁজে পান। কিশোরীর চাল ধোয়া ভিজে হাতের শীতলতা এবং কিশোরের পায়ে দলা মুথা ঘাসের ঘ্রাণে বাংলার শাশ্বত রূপটি পূর্ণতা পায়। পরিশেষে, লাল বটফলের বিষণ্ণ গন্ধ আর শান্ত নিস্তব্ধতার মধ্যে কবি অনুভব করেন যে, এই নিভৃত প্রকৃতিই হলো রূপসী বাংলার আসল ঠিকানা।

৫. ‘কামরাঙা লাল মেঘ যেন মৃত মনিয়ার মতো’- কামরাঙা লাল মেঘ কোথায় ডুবে যাই ? কবি লাল মেঘকে নীল সন্ধ্যায় ডুবে যাওয়ার যে অসামান্য ছবি এঁকেছেন তার তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও। ৫

উত্তরঃ জীবনানন্দ দাশের ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় সূর্যাস্তের পরবর্তী কামরাঙা লাল মেঘ গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে ডুবে যায়।

চিত্রকল্পের তাৎপর্য: প্রকৃতিপ্রেমী কবি জীবনানন্দ দাশ সূর্যাস্তের আকাশকে এক অনন্য ও বিষণ্ণ উপমায় সাজিয়েছেন। সূর্যাস্তের সময় পশ্চিম আকাশে মেঘের যে গাঢ় লাল আভা দেখা যায়, তাকে কবি ‘পাকা কামরাঙা’ ফলের লাল রঙের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই মেঘ যখন দিগন্তের গঙ্গাসাগরের বুকে মিলিয়ে যায়, তখন কবির মনে হয় যেন কোনো একটি ‘মৃত মনিয়া পাখি’ শান্ত জলের নিচে তলিয়ে গেল।

এই চিত্রকল্পের তাৎপর্য গভীর। এখানে ‘মৃত’ শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে কবি প্রকৃতির এক করুণ ও শান্ত রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। মনিয়া একটি ছোট ও চঞ্চল পাখি; তার নিথর হয়ে সাগরে ডুবে যাওয়া দিনের আলোর সমাপ্তি এবং নিস্তব্ধ সন্ধ্যার আগমনকে নির্দেশ করে। লাল রঙের মেঘ এবং নীল সাগরের জলের মিলন এক মায়াবী বর্ণিল আভা তৈরি করে, যা কেবল বাংলার নিভৃত প্রকৃতিতেই সম্ভব। কবির এই তুলনাহীন কল্পনা পাঠককে প্রকৃতির এক গূঢ় রহস্যময়তা ও একাকীত্বের স্বাদ দেয়, যেখানে দিনের শেষ আলো টুকরো টুকরো হয়ে স্তব্ধ অন্ধকারের কোলে আশ্রয় নেয়।

৬. পৃথিবীর কোনো পথ এ কন্যারে দেখে নি কো’-‘এ কন্যা’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে ? কবির এরূপ ভাবনার কারণ কী ? ১+৪

উত্তরঃ জীবনানন্দ দাশের ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় ‘এ কন্যা’ বলতে কবি গ্রামবাংলার নীল রঙের শান্ত ও মায়াবী সন্ধ্যাকে বুঝিয়েছেন, যাকে তিনি এক রহস্যময়ী ‘কেশবতী কন্যা’ হিসেবে কল্পনা করেছেন।

কবির এরূপ ভাবনার কারণ—

কবি জীবনানন্দ দাশ প্রকৃতিকে কেবল জড় বস্তু হিসেবে দেখেননি, বরং তাকে এক জীবন্ত সত্তা হিসেবে অনুভব করেছেন। তাঁর এই অনন্য ভাবনার কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো—

স্বকীয় সৌন্দর্য: কবির মতে, বাংলার সন্ধ্যার যে শান্ত ও অনুগত রূপ, তা পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় না। বিদেশের বা শহরের কৃত্রিমতায় এই স্নিগ্ধতা অনুপস্থিত। তাই পৃথিবীর কোনো রাজপথ বা নাগরিক সভ্যতা এই রূপসী কন্যাকে দেখেনি।

অন্ধকারের রূপক: সূর্যাস্তের পর আকাশে যে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে, কবি তাকেই কোনো এক সুন্দরীর ঘন কালো চুলের রাশির সাথে তুলনা করেছেন। এই অন্ধকার যখন হিজল, জাম বা কাঁঠাল বনে ছড়িয়ে পড়ে, তখন মনে হয় যেন কোনো কেশবতী কন্যা তার কালো চুল এলিয়ে দিয়ে প্রকৃতিকে চুম্বন করছে।

ঘ্রাণ ও স্পর্শের অনুভূতি: এই কন্যার অস্তিত্ব কেবল চোখে দেখার নয়, বরং তা অনুভব করার। নরম ধানের গন্ধ, কলমীর ঘ্রাণ, হাঁসের পালক কিংবা সরপুঁটি মাছের আঁশটে গন্ধের মধ্যেই কবি এই কন্যার বা বাংলার প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পেয়েছেন।

পরিশেষে বলা যায়, কবির কাছে বাংলার এই সন্ধ্যা এক অনন্য মানবী রূপ ধারণ করেছে, যার নিবিড় মমতা ও রহস্যময় সৌন্দর্য কেবল বাংলার নিভৃত পল্লীপ্রকৃতির বুকেই সীমাবদ্ধ।

৭. ‘কিশোরীর চাল ধোয়া ভিজে হাত-শীত হাতখান-প্রসঙ্গ উল্লেখ করে পক্তিটির মূল ভাবটি বুঝিয়ে বলো। ৫

উত্তরঃ জীবনানন্দ দাশের ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় রূপসী বাংলার সান্ধ্য প্রকৃতির রূপ বর্ণনার প্রসঙ্গে ‘কিশোরীর চাল ধোয়া ভিজে হাত’-এর অনুষঙ্গটি এসেছে। কবি যখন ঘাসের ওপর বসে আকাশে সপ্তর্ষিমণ্ডল ফুটে উঠতে দেখেন, তখন তাঁর ইন্দ্রিয়লব্ধ অনুভূতিতে বাংলার যে শাশ্বত রূপ ধরা দেয়, এই পঙক্তিটি তারই অংশ।

পঙক্তিটির মূলভাব—

কবি জীবনানন্দ দাশ প্রকৃতির সৌন্দর্যকে কেবল আকাশ বা বনের দূরিলোকের সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর কাছে বাংলার প্রকৃত রূপ মিশে আছে মানুষের প্রাত্যহিক অতি সাধারণ ও তুচ্ছ কাজের মধ্যে। গ্রামীণ বাংলার ঘরে ঘরে সন্ধ্যায় যখন রান্নার আয়োজন চলে, তখন কোনো কিশোরী পুকুর বা নদীর ঠান্ডা জলে চাল ধুয়ে ঘরে ফেরে। সেই ভিজে হাতের ‘শীতলতা’ আসলে বাংলার শান্ত, স্নিগ্ধ ও সজীব প্রকৃতিরই এক স্পর্শযোগ্য রূপ।

এই চিত্রের মাধ্যমে কবি দুটি বিশেষ দিক ফুটিয়ে তুলেছেন—

শাশ্বত বাংলার রূপ: চাল ধোয়া একটি অতি সাধারণ গার্হস্থ্য কাজ, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গ্রামবাংলায় চলে আসছে। এই সাধারণ কাজের মধ্যেই বাংলার আসল প্রাণস্পন্দন লুকিয়ে আছে।

প্রকৃতির সাথে একাত্মতা: কিশোরীর হাতের সেই শীতল স্পর্শ কবির কাছে প্রকৃতিরই এক কোমল অঙ্গ। ধান, কলমী শাক বা সরপুঁটি মাছের গন্ধের মতো এই ভিজে হাতের শীতলতাও কবির কাছে বাংলার অনন্য পরিচয় বহন করে।

পরিশেষে বলা যায়, এই পঙক্তিটির মাধ্যমে কবি যান্ত্রিকতা বর্জিত এক শান্ত ও মায়াবী পল্লীজীবনের ছবি এঁকেছেন, যেখানে মানুষের জীবন আর প্রকৃতি একে অপরের পরিপূরক হয়ে ধরা দিয়েছে।

৮. ‘আমি পাই টের’- উদ্ধৃতাংশটির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে কবির কোন মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে তা নিজের ভাষায় লেখো। ৫

উত্তরঃ জীবনানন্দ দাশের ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় রূপসী বাংলার সান্ধ্য প্রকৃতির রূপ বর্ণনার শেষ পর্যায়ে কবি ‘আমি পাই টের’ কথাটি ব্যবহার করেছেন। যখন আকাশে সপ্তর্ষিমণ্ডল বা সাতটি তারা ফুটে ওঠে এবং চারদিকে শান্ত নীল সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে, তখন কবি প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে বসে যেসব সূক্ষ্ম অনুভূতি লাভ করেন, এখানে সেই প্রসঙ্গেরই অবতারণা করা হয়েছে।

কবির মনোভাবের বিশ্লেষণ: এই উদ্ধৃতাংশটির মাধ্যমে কবির প্রকৃতিচেতনা ও গভীর দেশপ্রেমের এক অনন্য মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে—

ইন্দ্রিয়লব্ধ অনুভূতি: কবি বাংলার রূপ কেবল চোখ দিয়ে দেখেননি, বরং ঘ্রাণ ও স্পর্শ দিয়ে অনুভব করেছেন। নরম ধানের গন্ধ, কলমীর ঘ্রাণ, হাঁসের পালক, সরপুঁটি মাছের আঁশটে গন্ধ কিংবা কিশোরীর চাল ধোয়া ভিজে হাতের শীতলতা— এই সবকিছুই কবির ইন্দ্রিয়কে সজাগ করে তোলে। কবি ‘টের পান’ যে, এই সাধারণ উপাদানগুলোর মধ্যেই বাংলার আসল প্রাণ লুকিয়ে আছে।

তুচ্ছের মাঝে মহত্ত্ব: কবির কাছে বাংলার সৌন্দর্য কোনো রাজকীয় ঐশ্বর্যে নেই, বরং তা আছে ঘাস, লতা-পাতা আর সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের ছোট ছোট অনুষঙ্গে। এই তুচ্ছ বিষয়গুলোই যে এক অখণ্ড সৌন্দর্যমণ্ডিত ‘রূপসী বাংলা’ তৈরি করে, কবি সেই সত্যটিই গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন।

নিভৃত আত্মিক যোগ: ‘টের পাওয়া’ শব্দটির মাধ্যমে কবি প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর এক নাড়ির সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়েছেন। প্রকৃতির এই নিস্তব্ধতা এবং রহস্যময়তাকে তিনি তাঁর হৃদয়ের গভীর দিয়ে গ্রহণ করেছেন।

পরিশেষে বলা যায়, কবির এই মনোভাব প্রমাণ করে যে, তিনি প্রকৃতির একনিষ্ঠ উপাসক। যান্ত্রিকতার বাইরে প্রকৃতির এই নিভৃত সান্নিধ্যই কবির কাছে পরম শান্তি ও সার্থকতা বয়ে আনে।

৯. “এরই মাঝে বাংলার প্রাণ”— এই পঙক্তিটির মধ্য দিয়ে কবির যে গভীর অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে তা নিজের ভাষায় বর্ণনা করাে।

অথবা, কবি কোথায় কীভাবে বাংলার প্রাণকে অনুভব করেছেন, আলােচনা করো।

উত্তরঃ ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতাটিতে সন্ধ্যাবেলায় পল্লীবাংলার যে রূপ ফুটে ওঠে তাই কবি জীবনানন্দ দাশ অপূর্ব ভাষায় বর্ণনা করেছেন। সূর্য অস্ত যাওয়ার পর গােধূলির লাল আভায় আকাশের মেঘ পাকা কামরাঙা ফলের মতাে লাল হয়ে ওঠে। সেই লাল মেঘ যখন দিগন্তরেখায় মিশে যায় তখন দিনরাত্রির সন্ধিক্ষণে শান্ত, নীল সন্ধ্যা নেমে আসে। আকাশে তখন সপ্তর্ষিমণ্ডলের সাতটি তারা সদ্য ফুটে উঠেছে। ঘাসের উপর বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে কবির মনে হয় যেন এক এলােকেশী কন্যার আবির্ভাব হয়েছে। মাটির বুকে ধীরে ধীরে নেমে আসা অন্ধকার যেন সেই ছড়িয়ে পড়া কালাে চুলের রাশি। জীবন্ত মানবীর চুলের মতাে সেই অন্ধকারের স্পর্শ কবি অনুভব করেন। তার মনে হয়, হিজল, কাঁঠাল, জামের পাতায় সেই চুলের আদরমাখা স্পর্শ অন্ধকার রূপে ঝরে পড়ছে। গাছপালা, লতাগুল্ম, মাটি, জল, মানুষ — সবার গন্ধ মিশে তৈরি হয় সেই কন্যার চুলের গন্ধ। এইভাবেই কবি প্রকৃতি এবং জীবজগৎকে মিলিয়ে প্রাণময়ী বাংলাকে অনুভব করেছেন। প্রকৃতি তার চেতনায় হয়ে উঠেছে এক জীবন্ত সত্তা।

📌 আরো দেখুনঃ

📌নবম শ্রেণি ইউনিট টেস্ট প্রশ্নপত্র Click Here

📌 নবম শ্রেণি বাংলা প্রশ্নোত্তর Click Here

WhatsApp Group Join Now
Telegram Group Join Now

Leave a Reply