আকাশে সাতটি তারা কবিতার বিষয়বস্তু নবম শ্রেণি বাংলা | Akase Satti Tara Kobitar Bisoibostu Class 9 Bengali wbbse

আকাশে সাতটি তারা
জীবনানন্দ দাশ
নবম শ্রেণি বাংলা (প্রথম ভাষা)

আকাশে সাতটি তারা কবিতার বিষয়বস্তু নবম শ্রেণি বাংলা | Akase Satti Tara Kobitar Bisoibostu Class 9 Bengali wbbse

📌নবম শ্রেণি ইউনিট টেস্ট প্রশ্নপত্র Click Here

📌 নবম শ্রেণি বাংলা প্রশ্নোত্তর Click Here

আকাশে সাতটি তারা কবিতার কবিতা, কবি পরিচিতি, উৎস, বিষয় সংক্ষেপ, নামকরণ নবম শ্রেণি বাংলা।

আকাশে সাতটি তারা
—জীবনানন্দ দাশ

কবি পরিচিতি—

জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) : রবীন্দ্র পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই কবির জন্ম অধুনা বাংলাদেশের বরিশালে। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরাপালক ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে – ধূসর পাণ্ডুলিপি, বনলতা সেন, মহাপৃথিবী, সাতটি তারার তিমির, রূপসী বাংলা, বেলা অবেলা কালবেলা প্রভৃতি। তাঁর রচিত আখ্যানের মধ্যে রয়েছে – মাল্যবান, সুতীর্থ, জলপাইহাটি প্রভৃতি পাঠ্য কবিতাটি তাঁর রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত।

• শব্দার্থ ও টীকা—

» আকাশে সাতটি তারা— আকাশের সপ্তর্ষিমন্ডলকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, পৌরাণিক মতানুযায়ী সাতজন ঋষি (মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, বশিষ্ঠ) নক্ষত্র হয়ে আকাশে অবস্থান করছেন।

» কামরাঙা—পাঁচ শিরা যুক্ত টক স্বাদের ফল বিশেষ,

» কামরাঙা-লাল মেঘ— অস্তাচলগামী সূর্যের আভায় দিগন্তের লাল আভাকে কামরাঙা ফলের সাথে তুলনা করা হয়েছে।

» মনিয়া— একধরনের পাখি।

» মৃত মনিয়া— মৃত মনিয়া পাখি, তার
মৃতরূপের কথা বলা হয়েছে, প্রাণের উদ্দীপনাহীন মনিয়া পাখির সঙ্গে সূর্যের অস্ত যাওয়ার তুলনা করা হয়েছে।

» গঙ্গাসাগর—গঙ্গা নদী এবং সমুদ্রের সঙ্গমস্থল, হিন্দুদের পবিত্র তীর্থস্থান, অস্তগামী সূর্য গঙ্গাসাগরে যেন ডুবে গেছে বলে চিত্রিত হয়েছে।

» অনুগত—বাধ্য।

» নীল সন্ধ্যা— সন্ধ্যাকালীন আকাশ গাঢ় নীল।

» কেশবতী কন্যা— মাথায় ঘন চুল সমৃদ্ধ কোনো মেয়ে,

» চুলের চুমা—চুলের চুম্বন,

» হিজল— এক ধরনের গাছ।

» অবিরত—বিরামবিহীন।

» কলমীর ঘ্রাণ— কলমীশাকের গন্ধ।
» শর— এক ধরনের ঘাস / নলখাগড়া
» চাঁদা-সরপুঁটি— এক ধরনের বড় পুঁটি মাছ।
» মুথাঘাস— এক ধরনের ঘাস যার শিকড় সুগন্ধী হয়।
» পায়ে-দলা—পদদলিত।
» টের—বুঝতে বা জানতে পারা।

উৎস : ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতাটি কবি জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থের ছয় সংখ্যক কবিতা। কাব্যগ্রন্থটি কবির মৃত্যুর পর ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের ফাল্গুন মাসে প্রকাশিত হয়। কবিতাগুলি লেখা হয়েছিল ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের ২৫ বছর আগে ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে। তখন কবিতাগুলি পাণ্ডুলিপিতে অপ্রকাশিত অবস্থায় ছিল। কবিতাগুলির নাম দেওয়া নেই। সংকলকগণ পাঠ্যভুক্ত কবিতার নাম রেখেছেন ‘আকাশে সাতটি তারা’। আলােচ্য কবিতাটি ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থ থেকে গৃহীত।

কবিতার সারসংক্ষেপ : আকাশে যখন সপ্তর্ষিমণ্ডল বা সাতটি তারা ফুটে ওঠে, তখন কবি ঘাসের ওপর বসে শান্ত ও অনুগত বাংলার নীল সন্ধ্যার আগমন প্রত্যক্ষ করেন।‌সূর্যাস্তের পর আকাশের মেঘের বর্ণকে কবি পাকা কামরাঙা ফলের লাল আভার সাথে তুলনা করেছেন। এই রক্তিম মেঘ যখন গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে মিশে যায়, তখন কবির মনে হয় যেন কোনো মৃত মনিয়া পাখির রক্ত ছড়িয়ে পড়েছে। কবি বাংলার নীল সন্ধ্যাকে এক ‘কেশবতী কন্যা’ হিসেবে কল্পনা করেছেন। সেই কন্যার ছড়িয়ে পড়া কালো চুলের স্নিগ্ধ ঘ্রাণ আর স্পর্শ যেন হিজল, কাঁঠাল বা জামের বনে অন্ধকারের রূপ ধরে নেমে আসে।

বাংলার এই সন্ধ্যারূপ কেবল দৃশ্যেই নয়, বরং তার ঘ্রাণে মিশে থাকে প্রাণের স্পন্দন। নরম ধানের গন্ধ, কলমীর ঘ্রাণ, হাঁসের পালক, সরপুঁটি মাছের আঁশটে গন্ধ, আর কিশোরীর চাল ধোয়া ভিজে হাতের শীতলতার মধ্যেই কবি বাংলার প্রকৃত রূপ ও আত্মাকে খুঁজে পান।

পরিশেষে বলা যায়, কবি এই কবিতায় সাধারণ ও তুচ্ছ জিনিসের মধ্য দিয়েই রূপসী বাংলার চিরন্তন সৌন্দর্য ও শান্তির এক কালজয়ী ছবি এঁকেছেন।

কবিতার বিস্তারিত আলোচনা—

জীবনানন্দ দাশের ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতাটি তাঁর ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সনেট। নিচে কবিতাটির প্রতিটি অংশ ও উপমার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো—

সন্ধ্যার আকাশ ও ‘কামরাঙা লাল মেঘ’—

কবিতার শুরুতে কবি যখন ঘাসের ওপর বসে থাকেন, তখন আকাশে সপ্তর্ষিমণ্ডল বা সাতটি তারা ফুটে ওঠে। সূর্যাস্তের সময় মেঘের যে রক্তিম আভা দেখা যায়, তাকে কবি পাকা কামরাঙা ফলের লাল রঙের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই লাল মেঘ যখন দিগন্তের বা গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে বিলীন হয়ে যায়, তখন কবির মনে হয় যেন কোনো একটি মৃত মনিয়া পাখি সাগরের জলে ডুবে গেল। এটি প্রকৃতির প্রতি কবির এক অনন্য সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি।

‘শান্ত অনুগত বাংলার নীল সন্ধ্যা’—

দিনের আলো ও রাতের অন্ধকারের সন্ধিক্ষণে যে মায়াবী আবছায়া তৈরি হয়, কবি তাকেই ‘নীল সন্ধ্যা’ বলেছেন। গ্রামবাংলার এই সন্ধ্যা শহুরে কোলাহলমুক্ত এবং প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে শান্তভাবে নেমে আসে বলে একে ‘শান্ত’ ও ‘অনুগত’ বলা হয়েছে। কবি অনুভব করেন এই নীল আভা যেন চরাচরকে এক স্নিগ্ধ শান্তিতে ঢেকে দিচ্ছে।

‘কেশবতী কন্যা’র রূপক—

কবি সন্ধ্যাকে একজন ‘কেশবতী কন্যা’ বা এলোকেশী মেয়ের রূপক হিসেবে কল্পনা করেছেন। সেই কাল্পনিক কন্যার ছড়িয়ে পড়া কালো চুলই আসলে সন্ধ্যার ঘন অন্ধকার।

স্পর্শ: কবি অনুভব করেন সেই কন্যার চুল তাঁর চোখে ও মুখে স্পর্শ করছে।

অজস্র চুমা: অন্ধকারের এই স্পর্শ যখন হিজল, কাঁঠাল বা জাম গাছের পাতায় পড়ে, কবি তাকে রূপসীর চুলের অজস্র চুম্বন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

অনন্যতা: কবি দাবি করেছেন পৃথিবীর অন্য কোনো পথ এই কন্যাকে দেখেনি, কারণ বাংলার প্রকৃতির এই নিজস্ব সৌন্দর্য কেবল এই পল্লীগ্রামেই সীমাবদ্ধ।

বাংলার গন্ধ ও চিরন্তন প্রাণ : কবিতার শেষ অংশে কবি কেবল চোখের দেখা নয়, বরং ঘ্রাণ ও অনুভূতির মাধ্যমে বাংলার প্রাণকে খুঁজে পেয়েছেন। তিনি এমন কিছু তুচ্ছ ও সাধারণ উপাদানের কথা বলেছেন যেগুলোর মধ্যেই বাংলার আসল পরিচয় লুকিয়ে আছে—

ঘ্রাণ: নরম ধানের গন্ধ, কলমীর ঘ্রাণ, হাঁসের পালক, এবং পুকুরের মাছের (চাঁদা-সরপুঁটি) আঁশটে গন্ধ।

স্পর্শ ও অনুভূতি: কিশোরীর চাল ধোয়া ভিজে হাতের শীতলতা, কিশোরের পায়ে দলা মুথা ঘাস, আর লাল বট ফলের ব্যথিত নীরবতা।

উপসংহার: এই সবকিছুর মধ্য দিয়েই কবি প্রমাণ করেছেন যে, বাংলার আসল সৌন্দর্য রাজপ্রাসাদে বা শহরে নয়, বরং প্রকৃতির এই ছোট ছোট উপাদানের মধ্যেই মিশে আছে। সাতটি তারা যখন আকাশে জেগে ওঠে, তখন এই রূপসী বাংলার নিবিড় সান্নিধ্যেই কবি তাঁর জীবনের সার্থকতা খুঁজে পান।

📌 আরো দেখুনঃ

📌নবম শ্রেণি ইউনিট টেস্ট প্রশ্নপত্র Click Here

📌 নবম শ্রেণি বাংলা প্রশ্নোত্তর Click Here

WhatsApp Group Join Now
Telegram Group Join Now

Leave a Reply