সাহিত্য মেলা
সপ্তম শ্রেণি বাংলা
সপ্তম শ্রেণির বাংলা ‘পাগলা গনেশ’ গল্পের লেখক পরিচিতি, বিষয় সংক্ষেপ, নামকরণ | Pagla Ganesh Golper Bisoibostu wbbse
সপ্তম শ্রেণির বাংলা ‘পাগলা গনেশ’ গল্পের লেখক পরিচিতি, বিষয় সংক্ষেপ, নামকরণ | Pagla Ganesh Golper Bisoibostu wbbse
📌সপ্তম শ্রেণি ইউনিট টেস্ট প্রশ্নপত্র Click Here
📌 সপ্তম শ্রেণি বাংলা প্রশ্নোত্তর Click Here
📌 অন্যান্য বিষয়ের প্রশ্নোত্তরঃ
📌 সপ্তম শ্রেণি ইংরেজি প্রশ্নোত্তর Click Here
📌 সপ্তম শ্রেণি ইতিহাস প্রশ্নোত্তর Click Here
📌 সপ্তম শ্রেণি ভূগোল প্রশ্নোত্তর Click Here
📌 সপ্তম শ্রেণি গণিত সমাধান Click Here
সপ্তম শ্রেণির বাংলা ‘পাগলা গনেশ’ গল্পের লেখক পরিচিতি, বিষয় সংক্ষেপ, নামকরণ, হাতে কলমে প্রশ্ন ও উত্তর | West Bengal Class 7 Bengali Pagla Ganesh Golper Question Answer wbbse
পাগলা গনেশ
—শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
লেখক পরিচিতিঃ শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় (১৯৩৫) : জন্ম ব্রহ্মপুত্র নদীর ধারে ময়মনসিংহে। পিতার রেলে চাকরির সূত্রে আশৈশব যাযাবর জীবন দেশের নানা স্থানে। স্কুলশিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবনের সূচনা, পরে আনন্দবাজার পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত। প্রথম উপন্যাস ‘ঘুণপোকা’, প্রথম কিশোর উপন্যাস ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’। কিশোর সাহিত্যে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন ১৯৮৫ সালের ‘বিদ্যাসাগর পুরস্কার’। এছাড়াও পেয়েছেন ‘আনন্দ পুরুস্কার’, ‘সাহিত্য অকাদেমি’ পুরস্কার। সব ধরনের খেলায় বক্সিং, টেনিস, ক্রিকেট, ফুটবল, টি.টি., অ্যাথলেটিকস-এ তাঁর উৎসাহ অদম্য। পাঠক হিসেবেও সর্বগ্রাসী। ভালোবাসেন থ্রিলার, কল্পবিজ্ঞানের কাহিনি।
∆ শব্দার্থ:
• প্রতিরোধকারী– প্রতিরোধ করেছে বা বাধা দিয়েছে এমন।
• উড়ান যন্ত্র– যাতে চড়ে উড়ে বেড়ানো যায় এমন যন্ত্র।
• সশরীরে– শরীর সহ বা শরীর নিয়ে।
• অনাবশ্যক– যার দরকার নেই।
• ভাবাবেগ– আবেগ বা অনুভূতির আধিক্য, বিহ্বলতা।
• খামোখা– অকারণে, অনর্থক।
• বিলুপ্ত– সম্পূর্ণ লোপ পেয়েছে এমন।
• মেদুর– স্নিগ্ধ ও কোমল।
• উদ্রেক– সঞ্চার, উদয়।
• মৃত্যুঞ্জয়– মরণকে জয় করেছে এমন।
• অবজার্ভেটরি– মানমন্দির।
• গ্রহ– নক্ষত্র প্রভৃতি পর্যবেক্ষণের গবেষণাগার।
• ল্যাবরেটরি/গবেষণাগার– (বিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়ে) যেখানে গবেষণা করা হয়।
• অন্তরীক্ষ– আকাশ।
• নিপাট– একেবারে, নিতান্ত, নিছক।
• অন্তহীন– শেষ নেই যার।
• আয়ু– জীবনকাল। • কৃতী– সফল, সার্থক।
• সসম্ভ্রমে– সম্মান / মর্যাদা সহ।
• অভিবাদন– নমস্কার বা কোনোভাবে সম্মান প্রদর্শন (দেখানো/জানানো)।
• নিরীহ– নির্বিরোধ, কারো ক্ষতি করে না এমন।
• মন্ত্রমুগ্ধ– মন্ত্রের দ্বারা সম্পূর্ণ বশীভূত।
• উচ্ছন্নে যাওয়া– অধঃপাতে যাওয়া।
• মকসো– অভ্যাস।
উৎসঃ কল্পবিজ্ঞানের কাহিনি অবলম্বন করে আধুনিক যুগের বিশিষ্ট লেখক “শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়” এক গল্পগ্রন্থ রচনা করেছেন, যার নাম “পাগলা গণেশ”। আর আমাদের পাঠ্য “পাগলা গণেশ” গল্পটি তাঁর এই গল্পগ্রন্থের একটি প্রধান গল্প।
বিষয়সংক্ষেপঃ এই গল্পে ভবিষ্যতের কথা বলা হয়েছে। ৩৫৮৯ সালে বিজ্ঞান নির্ভর এক কল্পিত পৃথিবীর কথা গল্পকার আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। এক বিশেষ ধরণের মলম আবিষ্কৃত হওয়ায় মানুষ মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বাধাকে অতিক্রম করে তাদের সাম্রাজ্য সুদূর এভারেষ্ট পর্যন্ত বিস্তার করেছে। এমনকি অন্যান্য নক্ষত্রপুঞ্জেও মানুষ তাদের কৌতুহলী দৃষ্টি নিয়ে ছুটে গিয়েছে। পৃথিবীতে মৃত্যুঞ্জয় টনিক আবিষ্কার হওয়ার ফলে আর কেউ মারা যাচ্ছে না। সবাই বিজ্ঞানী হয়ে উঠেছে। নাচ, গান, কবিতা প্রভৃতি সকল সুকুমার মনোবৃত্তি মানুষ হারিয়ে ফেলে বিজ্ঞানের জয়যাত্রায় যেনো যন্ত্রমানব হয়ে উঠেছে।
ঠিক এইরূপ পরিস্থিতিতে গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র গণেশ হিমালয়ের কোলে বসে সাংস্কৃতিক চর্চায় মেতে ওঠেন। তিনি কবিতা লিখে বাতাসে ভাসিয়ে দিতে থাকেন, আনন্দের গান করে, ছবি এঁকে সকলের মনে হারিয়ে যাওয়া অনুভূতিগুলিকে পুনরায় জাগিয়ে তুলতে চান। তার এই প্রচেষ্টায় প্রাথমিকভাবে আকৃষ্ট হন তারই এক প্রাক্তন ছাত্র, যিনি বর্তমানে একজন পুলিশ। তিনি গণেশের কথায় উদবুদ্ধ হয়ে প্রথমে তার মা ও স্ত্রীকে নিয়ে আসেন। তারাও গণেশের কথায় প্রবলভাবে আকর্ষিত হয়ে ওঠেন। এরপরে তিনি তাঁর অন্যান্য পুলিশ বন্ধুদের আনতে শুরু করেন। রাষ্ট্রপুঞ্জ থেকে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আসেন। তিনি গণেশকে জানান যে, গণেশের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে পৃথিবী জুড়ে সবাই আবার গান গাইছে, কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে। আর তখন গণেশ বুঝতে পারেন যে, পৃথিবীটা হয়তো যান্ত্রিক হয়ে যাবার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।
নামকরণ: নামকরণের মাধ্যমেই কোনো সাহিত্য বা রচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে একটি আগাম ধারণা পাওয়া যায়। পাগলা গণেশ গল্পটির নামকরণের সার্থকতা বিশ্লেষণ করে দেখা যেতে পারে, ‘পাগল’ শব্দের অর্থ উন্মত্ত, বা অবোধ। মনের মানুষকে আমরা ‘পাগল’ বা আদর করে পাগলা বলে থাকি। ৩৫৮৯ খ্রিস্টাব্দের নিরিখে কবিতা, গান, ছবি আঁকা, কথাসাহিত্য, নাটক, সিনেমা -এসব নিয়ে মাথা ঘামানোটা নিতান্তই পাগলামি। দয়া, মায়া, করুণা, ভালোবাসা -সবই সেই যুগে ‘অনাবশ্যক ভাবাবেগ’ ছাড়া আর কিছুই নয়। ব্যতিক্রম শুধু গণেশ। দেড়শো বছর আগে যখন শিল্প, সংগীত ও সাহিত্যচর্চার পাট উঠে যেতে থাকল, তখন তিনি গোটা ব্যাপারটাকেই অপছন্দ করতে শুরু করেন। বিজ্ঞানের বাড়াবাড়িরও একটা সীমা থাকা উচিত বলে মনে করেছিলেন তিনি। প্রতিটি মানুষ তখন বুঁদ হয়ে আছে বিজ্ঞানে। বিজ্ঞান ছাড়া অন্য কোনো চর্চাই তখন আর নেই, নেই খেলাধুলোর কোনো আয়োজন, প্রকৃতির রূপ-রং তখন মানুষের মনে আর সাড়া জাগায় না। এই সময়ে গণেশ কালের চাকার গতি উলটো দিকে ঘোরাতে পারবেন না জেনেই আশ্রয় নেন সভ্যসমাজ থেকে বহুদূরে, হিমালয়ের একটা গিরিগুহায়। গণেশ সেখানে বসে কবিতা লেখেন আর ভাসিয়ে দেন বাতাসে, ছবি আঁকেন, গলা ছেড়ে গান গেয়ে ওঠেন। তিনি আশা রাখেন, একদিন তাঁর কবিতা কারও কাছে পৌঁছোবে। প্রথমে মানুষ তাঁকে উপহাস করলেও ক্রমে তাঁর গুণমুগ্ধ মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তাঁর অনুপ্রেরণায় লোকে গান গাইতে শুরু করে, কবিতা পড়ে, হিজিবিজি ছবি আঁকে। গণেশকে সবাই পাগল ভাবে। অথচ এমানুষটি একাই প্রাণপণে দুনিয়াকে যান্ত্রিকতার হাত থেকে বাঁচানোর লড়াই চালিয়ে যান। মানুষের জীবন সুন্দর করে গড়ে তুলতে চান তিনি। তাই ‘পাগলা গণেশ’ নামটি অত্যন্ত যথার্থ ও সংগত হয়েছে।
পাগলা গনেশ গল্প :
পাগলা গনেশ
—শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
মাধ্যাকর্ষণ ও ধ্যাকর্ষণ প্রতিরোধকারী মলম আবিষ্কার হওয়ার পর থেকে পৃথিবীতে নানারকম উড়ান যন্ত্র আবিষ্কারের একটা খুব হিড়িক পড়ে গেছে। কেউ ডাইনিদের বাহন ডান্ডাওলা ঝাঁটার মতো, কেউ নারদের ঢেঁকির মতো, কেউ কার্পেটের মতো, কেউ কার্তিকের বাহন ময়ূরের মতো উড়ান যন্ত্র আবিষ্কার করে তাতে চড়ে বিষয়কর্মে যাতায়াত করছে।
আকাশে তাই সবসময়েই নানারকম জিনিস উড়তে দেখা যায়।
এমন কি কৃত্রিম পাখনাগুলা মানুষকেও।
সালটা ৩৫৮৯। ইতিমধ্যে চাঁদ, মঙ্গল এবং শুক্রগ্রহে মানুষ ল্যাবরেটরি স্থাপন করেছে, সূর্যের আরও দুটি গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে এবং জানা গেছে আর কোনো গ্রহ নেই। মহাকাশের নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে হাজার হাজার মানুষ আলোর চেয়েও গতিবেগসম্পন্ন মহাকাশযানে রওনা হয়ে গেছে এক-দেড়শো বছর আগে থেকে এবং এখনও অনেকে যাচ্ছে। কাছেপিঠে যারা গেছে তাদের ফেরার সময় হয়ে এল। তবে সেটা এক মিনিট পর না একশো বছর পর, তা জানবার উপায় নেই।
তা বলে পৃথিবীর মানুষেরা হাল ছাড়েনি। সেই এক দেড়শো বছর আগে যারা জন্মেছিল তারা সকলেই সশরীরে বর্তমান। আজকাল পৃথিবীতে মানুষ মরে না। যারা মহাকাশে গেছে তারা ফিরে এসে সেই আমলের লোকেদের দেখতে পাবে। তবে সব মানুষই বেঁচে আছে বলে নতুন মানুষের জন্মও আর হচ্ছে না। গত দেড়শো বছরের মধ্যে কেউ পৃথিবীতে শিশুর কান্না শোনেনি।
এদিকে ঘরে ঘরে মানুষ এত বেশি বিজ্ঞান নিয়ে বুঁদ হয়ে আছে যে, প্রতিঘরের প্রত্যেকেই কোনো না কোনো বিজ্ঞানের বিজ্ঞানী।
বিজ্ঞান ছাড়া অন্য কোনো চর্চাই নেই। কবিতা, গান, ছবি আঁকা, কথাসাহিত্য, নাটক, সিনেমা এসব নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। ওসব অনাবশ্যক ভাবাবেগ কোনো কাজেই লাগে না।
খামোখা সময় নষ্ট।
খেলাধুলোর পাটও ঢুকে গেছে।
অলিম্পিক উঠে গেছে। বিশ্বকাপ বিলুপ্ত। আছে শুধু বিজ্ঞান আর বিজ্ঞান।
পূর্ণিমার চাঁদ দেখলে, কোকিলের ডাক শুনলে বা পলাশ ফুল ফুটলে কেউ আর আহা উহু করে না। বর্ষাকালের বৃষ্টি দেখলে কারও মন আর মেদুর হয় না। ওগুলোকে প্রাকৃতিক কার্যকারণ হিসেবেই দেখা হয়।
গোলাপ ফুলের সৌন্দর্যের চেয়ে তার অ্যানালাইসিসটাই বেশি জরুরি। দয়া মায়া করুণা ভালোবাসা ইত্যাদিরও প্রয়োজন না থাকায় এবং চর্চার অভাবে মানুষের মনে আর ওসবের উদ্রেক হয় না।
ব্যতিক্রম অবশ্য এক আধজন আছে।
যেমন পাগলা গণেশ। পাগলা গণেশের বয়স দুশো বছর।
তার পঞ্চাশ বছর বয়সে, অর্থাৎ আজ থেকে দেড়শো বছর আগে মৃত্যুঞ্জয় টনিক আবিষ্কার হয়। গণেশও আর সকলের মতো টনিকটা খেয়েছিল। ফলে তার মৃত্যু বন্ধ হয়ে গেল। দেড়শো বছর আগে যখন সুকুমার শিল্পবিরোধী আন্দোলন শুরু হলো এবং শিল্প সংগীত সাহিত্য ইত্যাদির পাট উঠে যেতে লাগল, তখন গণেশের ব্যাপারটা পছন্দ হয়নি। তাছাড়া বিজ্ঞানের বাড়াবাড়িরও একটা সীমা থাকা দরকার বলে তার মনে হলো।
গণেশ অনেক চেষ্টা করে যখন দেখল কালের চাকার গতি উল্টোদিকে ফেরানো যাবে না, তখন সে সভ্য সমাজ থেকে দূরে থাকার জন্য হিমালয়ের একটা গিরিগুহায় আশ্রয় নিল।
তা বলে হিমালয় যে খুব নির্জন জায়গা তা নয়। এভারেস্টের চূড়া চেঁছে অবজার্ভেটরি হয়েছে, রূপকুণ্ডে বায়োকেমিস্ট্রির ল্যাবরেটরি, কে টু, কাঞ্চনজঙ্ঘা, যমুনেত্রী, গঙ্গোত্রী, মানস সরোবর সর্বত্রই নানা ধরনের গবেষণাগার। সমুদ্রের তলাতেও চলছে নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা। অর্থাৎ ভূগর্ভে, ভূপৃষ্ঠে এবং অন্তরীক্ষে কোথাও নিপাট নির্জনতা নেই। পৃথিবীর জনসংখ্যা যে খুব বেশি তা নয়। কিন্তু তারা সমস্ত পৃথিবীতে এমনভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যে, নির্জনতা খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন কাজ।
এই তো আজ সকাল থেকে গণেশ বসে কবিতা লিখেছে। একটু আগে একটা ঢেঁকি আর একটা ভেলায় চড়ে দুটো লোক এসে বলল, এই যে গণেশবাবু, কী করছেন?
কবিতা লিখছি।
কবিতা? হোঃ হোঃ হোঃ। তা আপনার কবিতা শুনছেই বা কে আর পড়ছেই বা কে?
আকাশ শুনছে, বাতাস শুনছে, প্রকৃতি শুনছে। কবিতার পাতা বাতাসে ভাসিয়ে দিচ্ছি। যদি কেউ কুড়িয়ে পায় আর পড়তে ইচ্ছে হয় তো পড়বে।
হোঃ হোঃ হোঃ হোঃ!
কদিন আগে সন্ধেবেলা গণেশ একদিন গলা, ছেড়ে গান গাইছিল। তার গানের গলা বেশ ভালোই।
হঠাৎ দুটো পাখাওলা লোক লাসা থেকে ইসলামাবাদ যেতে যেতে নেমে এসে রীতিমতো ধমক দিয়ে বলল, ও মশাই, অমন বিকট শব্দ করছেন কেন?
শব্দ কী! এ যে গান!
গান। ওকেই কি গান বলে নাকি। ধুর মশাই, এ যে বিটকেল শব্দ!
একদিন পাহাড়ের গায়ে যান্ত্রিক বাটালি দিয়ে পাথর কেটে ছবি আঁকছিল গণেশ। হঠাৎ একটা ধামা নেমে এল। এক মহিলা খুব আগ্রহের সঙ্গে বলে চলেন, এটা কীসের সার্কিট ডিজাইন বলুন তো। বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে।
ডিজাইন নয়, ছবি। খেয়ালখুশির ছবি।
ভদ্রমহিলা চোখের পলক না ফেলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, খেয়েদেয়ে আর কাজ নেই! ছবি হচ্ছে! খুঁঃ।
গণেশ জানে, একা সে পৃথিবীর গতি কিছুতেই উল্টে দিতে পারবে না। কিন্তু একা বসে বসে যে নিজের মনের মতো কিছু করবে তারও উপায় নেই। এই মৃত্যুহীন জীবন, এই অন্তহীন আয়ু কি এভাবেই যন্ত্রণার মধ্যে কাটাতে হবে? সুইসাইড করেও কোনো লাভ নেই। আজকাল মরা মানুষকে বাঁচিয়ে তোলা শক্ত কাজ তো নয়ই, বরং পৃথিবীর জনসংখ্যার ভারসাম্য রাখতে তা করা আবশ্যিক।
গণেশের তিন ছেলে, এক মেয়ে। বড়ো ছেলের বয়স একশো চুয়াত্তর বছর, মেজোর একশো একাত্তর, ছোটো ছেলের একশো আটষট্টি এবং মেয়ের বয়স একশো ছেষট্টি। প্রত্যেকেই কৃতী বিজ্ঞানী। তারা অবশ্য বাপের কাছে আসে না। অন্তত গত একশো বছরের মধ্যে নয়। গণেশ তাদের মুখশ্রী ভুলে গেছে। গণেশের স্ত্রী ক্যালিফোর্নিয়া মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রে কাজ করতেন, দেড়শো বছর আগে তিনি অ্যান্ড্রোমিডা নক্ষত্রপুঞ্জে রওনা হয়ে যান। এখনও ফেরেননি।
আজ সকালে গণেশকে কবিতায় পেয়েছে। কবিতা লিখছে আর ভাসিয়ে দিচ্ছে বাতাসে। কবিতার কাগজগুলো বাতাসে কাটা ঘুড়ির মতো লাট খাচ্ছে, ঘুরছে ফিরছে, ভাসছে, পাক খাচ্ছে, তারপর পাহাড়ের গা বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে চলে যাচ্ছে অনেক দূর। প্রতিদিন যত কবিতা লিখেছে গণেশ, সবই এইভাবে ভাসিয়ে দিয়েছে। যদি কারও কাছে পৌঁছোয়, যদি কেউ পড়ে।
আকাশে একটা পিপে ভাসছিল। গণেশ লক্ষ করেনি। পিপেটা ধীরে ধীরে নেমে এল। নামল একজন পুলিশম্যান। গণেশকে সসম্ভ্রমে অভিবাদন করে বলল, স্যার, এককালে আপনি যখন কলকাতার সায়েন্স কলেজে মাইক্রো ইলেকট্রনিক্স পড়াতেন, তখন আমি আপনার ছাত্র ছিলাম। কিন্তু এসব আপনি কী করছেন? পাহাড়ময় কাগজ ছড়াচ্ছেন কেন? এটা কি নতুন ধরনের কোনো গবেষণা?
করছি। গণেশ মাথা নাড়ল, না হে না, ওসব গবেষণা টবেষণা আমি ভুলে গেছি। আমি পৃথিবীকে বাঁচানোর চেষ্টা
তার মানে? পৃথিবী তো দিব্যি বেঁচে আছে। মরার কোনো লক্ষণই নেই।
মরছে। পৃথিবী মরছে। পরে টের পাবে।
এ কাগজগুলো কি কোনো প্রেসক্রিপশন? পৃথিবীর বাঁচবার ওষুধ?
ঠিক তাই। ওগুলো কবিতা। তুমি পড়ে দেখতে পারো।
লোকটা মাথার হেলমেট খুলে মাথা চুলকে হতভম্বের মতো বলল, কবিতা!
হ্যাঁ। কবিতা পড়ো?
লোকটা পায়ের কাছে পড়ে থাকা একটা পাক-খাওয়া কাগজ কুড়িয়ে নিয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল।
কিছু বুঝলে?
লোকটা অসহায় ভাবে মাথা নেড়ে বলল, কিছু বুঝতে পারছি না স্যার। কোনোদিন এ জিনিস পড়িনি।
তোমার বয়স কত?
একশো একান্ন বছর।
বাচ্চা ছেলে।
আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার। আমাদের আমলে শিক্ষানিকেতনে এসব পড়ানো হতো না। শুনেছি তারও অনেক আগে কবিতা নামে কী যেন ছিল।
লোকটি নিরীহ এবং ভালোমানুষ দেখে গণেশবাবু হুকুমের সুরে বলে উঠল, মনে মনে পড়লে হবে না। জোরে জোরে পড়ো।
লোকটি কাগজটার দিকে চেয়ে থেমে থেমে পড়তে লাগল, গ্রহটি সবুজ ছিল, গাঢ় নীল জল, ফিরোজা আকাশ… কোকিলের ডাক ছিল, প্রজাপতি, ফুলের সুবাস… আধো আধো বোল ছিল, টলে টলে হাঁটা ছিল, শিশু ভোলানাথ-শৈশব ভাসায়ে জলে, কবি যে বৃহৎ হলে, নামিল আঘাত।-
থামো, বুঝলে কিছু?
লোকটি মাথা নেড়ে বলে, কিছুই বুঝিনি স্যার।
একটুও না?
লোকটা মাথা নেড়ে বলল, শুধু মনে পড়ছে একসময়ে আমিও টলে টলে হাঁটতে শিখেছিলুম-
গণেশ হতাশ হলো। কবিতা তার ভালো হয়নি ঠিকই, কিন্তু না বুঝবার মতো নয়।
লোকটা গণেশকে অভিবাদন করে চলে গেল, যেন একটু ভয়ে ভয়েই।
পরদিন সকালে রোজকার মতো কবিতা লিখতে বসেছে গণেশ। এমন সময় একটা বড়ো সড়ো পিপে এসে সামনে নামল।
স্যার।
গণেশ তাকিয়ে দেখে, সেই লোকটি, সঙ্গে দুই মহিলা।
আমার স্ত্রী আর মাকে সঙ্গে নিয়ে এলাম। আমার মা কবিতার ব্যাপারটা খানিকটা জানে। এরা দুজনেই কবিতা শুনতে চায়।
গণেশ অবাক এবং খুশি দুই-ই হলো। তবে কবিতা শুনিয়েই ছাড়ল না। গান শোনালো, ছবি দেখালো।
তিনজন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বসে রইল।
কিছু বুঝতে পারছো তোমরা?
তিনজনেই মাথা নেড়ে জানাল, না।
লোকটা বিনীত ভাবেই বলল, না বুঝলেও আমার মধ্যে কী যেন একটা হচ্ছে।
কী হচ্ছে?
ঠিক বোঝাতে পারব না।
পরদিন লোকটা ফের এল। সঙ্গে আরও চারজন পুলিশম্যান।
এরা স্যার আমার সহকর্মী, কবিতা গান ছবির ব্যাপারটা বুঝতে চায়।
গণেশ খুব খুশি। বোসো বোসো।
পাঁচজন শ্রোতা ও দর্শক ঘণ্টা দুই ধরে গণেশের কবিতা শুনল, গান শুনল, ছবি দেখল। কেউ ঠাট্টা বিদ্রুপ করল না। গম্ভীর হয়ে রইল।
আছে। পরদিন লোকটা এল না। কিন্তু জনা দশেক লোক এল। পুলিশ আছে, বৈজ্ঞানিক আছে, টেকনিশিয়ান
পরদিন আরও কিছু লোক বাড়ল।
পরদিন আরও।
আরও।
এক সপ্তাহ পরে রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব তাঁর বিমান থেকে নামলেন গণেশের ডেরায়। এ আপনি কী কান্ড করেছেন? পৃথিবী যে উচ্ছন্নে গেল! লোকে গান গাইতে লেগেছে, কবিতা মকসো করছে, হিজিবিজি ছবি আঁকছে।
গণেশ হোঃ হোঃ করে হেসে উঠে বলল, যাঃ তাহলে আর ভয় নেই। দুনিয়াটা বেঁচে যাবে…
◆ প্রথম ইউনিট টেস্ট বাংলা প্রশ্নোত্তর
◆ ছন্দে শুধু কান রাখো কবিতার প্রশ্ন উত্তর
◆ পাগলা গনেশ গল্পের প্রশ্ন উত্তর
◆ বঙ্গভূমির প্রতি কবিতার বিষয়বস্তু
◆ বঙ্গভূমির প্রতি কবিতার প্রশ্ন উত্তর
◆ মাতৃভাষা কবিতার প্রশ্ন উত্তর
◆ আঁকা লেখা কবিতার প্রশ্ন উত্তর
◆ খোকনের প্রথম ছবি প্রশ্ন উত্তর
◆ কুতুবমিনারের কথা প্রশ্ন উত্তর
◆ মাকু প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায় প্রশ্ন উত্তর
◆ ভাষাচর্চা প্রথম অধ্যায় প্রশ্ন উত্তর
📌 আরো দেখুনঃ
📌সপ্তম শ্রেণি ইউনিট টেস্ট প্রশ্নপত্র Click Here
📌 অন্যান্য বিষয়ের প্রশ্নোত্তরঃ
📌 সপ্তম শ্রেণি বাংলা প্রশ্নোত্তর Click Here
📌 সপ্তম শ্রেণি ইংরেজি প্রশ্নোত্তর Click Here
📌 সপ্তম শ্রেণি ইতিহাস প্রশ্নোত্তর Click Here
📌 সপ্তম শ্রেণি ভূগোল প্রশ্নোত্তর Click Here
📌 সপ্তম শ্রেণি গণিত সমাধান Click Here
📌 অন্যান্য ক্লাসের বাংলা প্রশ্নোত্তরঃ
📌পঞ্চম শ্রেণি বাংলা প্রশ্নোত্তর Click Here
📌 ষষ্ঠ শ্রেণি বাংলা প্রশ্নোত্তর Click Here
📌 অষ্টম শ্রেণি বাংলা প্রশ্নোত্তর Click Here
📌 নবম শ্রেণি বাংলা প্রশ্নোত্তর Click Here
