কুমোরে পোকার বাসাবাড়ি
—গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য
কুমোরে পোকার বাসাবাড়ি গল্পের প্রশ্ন উত্তর ষষ্ঠ শ্রেণি বাংলা | Kumore Pokar Basabari Golper Question Answer Class 6 Bengali wbbse
📌ষষ্ঠ শ্রেণি ইউনিট টেস্ট প্রশ্নপত্র Click Here
📌ষষ্ঠ শ্রেণি বাংলা প্রশ্নোত্তর Click Here
∆ কুমোরে পোকার বাসাবাড়ি পাঠ্য গল্প—
আমাদের দেশে ঘরের আনাচে-কানাচে বা দেয়ালের গায়ে লম্বাটে ধরনের এবড়ো- খেবড়ো এক-একটা শুকনো মাটির ডেলা লেগে থাকতে দেখা যায়। সেগুলি একপ্রকার কালো রঙের লিকলিকে কুমোরে-পোকার বাসা। এই পোকাগুলির গায়ের রং আগাগোড়া মিশমিশে কালো। কেবল শরীরের মধ্যস্থলের বোঁটার মতো সরু অংশটি হলদে। ডিম পাড়বার সময় হলেই এরা বাসা তৈরি করবার জন্য উপযুক্ত স্থান খুঁজতে বের হয়। দুই-চার দিন ঘুরে-ফিরে মনোমতো কোনো স্থান দেখতে পেলেই তার আশেপাশে বারবার ঘুরে বিশেষভাবে পরীক্ষা করে দেখে। তারপর খানিক দূর উড়ে গিয়ে আবার ফিরে আসে এবং স্থানটাকে পুনঃপুনঃ দেখে নেয়। দু-তিনবার এরূপভাবে এদিক-ওদিক উড়ে অবশেষে কাদামাটির সন্ধানে বের হয়। যতটা সম্ভব নিকটবর্তী স্থানে কাদামাটি সন্ধান করতে সময় সময় দু-একদিন চলে যায়। কাদামাটির সন্ধান পেলেই বাসা নির্মাণের জন্য সেই স্থান থেকে নির্বাচিত স্থানে যাতায়াত করে রাস্তা চিনে নেয়। সাধারণত আশেপাশে চল্লিশ-পঞ্চাশ গজ ব্যবধান থেকে মাটি সংগ্রহ করে থাকে। কিন্তু অত কাছাকাছি বাসা নির্মাণের উপযোগী মাটি না পেলে সময় সময় দেড়-দুশো গজ দূর থেকেও মাটি সংগ্রহ করে থাকে। কাছাকাছি কোনো স্থান থেকে মাটি সংগ্রহ করে বাসার একটা কুঠুরি নির্মাণ প্রায় শেষ করে এনেছে, এমন সময় সেই স্থানে কাদামাটি চাপা দিয়ে বা বাসাটা সরিয়ে ফেলে দেখেছি—সংস্কারবশেই হোক আর বুদ্ধি করেই হোক, কুমোরে-পোকাটা বাসার সন্ধান না পেয়ে কোনো একটা জলাশয়ের পাড়ে উড়ে গিয়ে সেখান থেকে ভিজা মাটি সংগ্রহ করে পূর্বের জায়গায় নতুন করে বাসা তৈরি শুরু করেছে। যতবারই এরূপ করেছি, ততবারই দেখেছি পুকুর বা নালা, ডোবা যত দূরেই থাকুক না কেন, সেখান থেকেই ভিজা মাটি এনে বাসা তৈরি করেছে। এইসব অসুবিধার জন্য অবশ্য বাসা নির্মাণে যথেষ্ট বিলম্ব ঘটে। একটি কুঠুরি তৈরি হয়ে গেলেই তার মধ্যে উপযুক্ত পরিমাণ খাদ্য, অর্থাৎ পোকামাকড় ভরতি করে তাতে একটি মাত্র ডিম পেড়ে মুখ বন্ধ করে তারই গা ঘেঁষে নতুন কুঠুরি নির্মাণ শুরু করে। কাজেই এ থেকে মনে হয় যে, কুমোরে-পোকা ইচ্ছামতো ডিম পাড়বার সময় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
বাসা নির্মাণের জন্য মাটি সংগ্রহ করবার সময় উড়ে গিয়ে ভিজা মাটির উপর বসে এবং লেজ নাচাতে নাচাতে এদিক-ওদিক ঘুরেফিরে দেখে। উপযুক্ত মনে হলেই সেখান থেকে ভিজা মাটি তুলে নিয়ে চোয়ালের সাহয্যে খুব ছোট্ট এক ডেলা মাটি মটরদানার মতো গোল করে মুখে করে উড়ে যায়। মাটি খুঁড়ে তোলবার সময় অতি তীক্ষ্ণ স্বরে একটানা গুনগুন শব্দ করতে থাকে। মুখ দিয়ে চেপে চেপে মাটির ডেলাটিকে দেয়ালের গায়ে অর্ধ-চক্রাকারে বসিয়ে দেয়। মাটির ডেলাটিকে লম্বা করে চেপে বসাবার সময়ও তীক্ষ্ণস্বরে একটানা গুনগুন শব্দ করতে থাকে। কোনো অদৃশ্য স্থানে বাসা বাঁধবার সময়ও এই গুনগুন শব্দ শুনেই বুঝতে পারা যায়, কুমোরে-পোকা বাসা বাঁধছে। পুকুর ধারে কাদামাটির উপর মাছির মতো একপ্রকার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পোকা ঘুরে ঘুরে আহার সংগ্রহ করে। এরূপ স্থলে মাটি তোলবার সময় ওইরূপ কোনো পোকা তার কাছে এসে পড়লে মাটি তোলা বন্ধ রেখে তাকে ছুটে গিয়ে তাড়া করে। যাহোক, বারবার এরূপ এক-এক ডেলা মাটি এনে ভিতরের দিকে ফাঁকা রেখে ক্রমশ উপরের দিকে বাসা গেঁথে তুলতে থাকে। প্রায় সওয়া ইঞ্চি লম্বা হলেই গাঁথুনি ক্ষান্ত করে। এরূপ একটি কুঠুরি তৈরি করতে প্রায় দু-দিন সময় লেগে যায়। ইতিমধ্যে মাটি শুকিয়ে বাসা শক্ত হয়ে যায়। কুমোরে-পোকা তখন কুঠুরির ভিতরে প্রবেশ করে মুখ থেকে একপ্রকার লালা নিঃসৃত করে তার সাহায্যে কুঠুরির ভিতরের দেয়ালে প্রলেপ মাখিয়ে দেয়। প্রলেপ দেওয়া শেষ হলে শিকারের অন্বেষণে বের হয়। আমাদের দেশে বিভিন্ন জাতীয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাকড়সার অভাব নেই; তারা জাল বোনে না, ঘুরে ঘুরে শিকার ধরে। এই কুমোরে-পোকারা বেছে বেছে এরূপ ভ্রমণকারী মাকড়সা শিকার করে থাকে। কোনোরকমে মাকড়সা একবার চোখে পড়লেই হলো, ছুটে গিয়ে তার ঘাড় কামড়ে ধরে। কিন্তু কামড়ে ধরলেও একেবারে মেরে ফেলে না। শরীরে হুল ফুটিয়ে একরকম বিষ ঢেলে দেয়। একবার হুল ফুটিয়ে নিরস্ত হয় না। কোনো কোনো মাকড়সাকে পাঁচ-সাতবার পর্যন্ত হুল ফুটিয়ে থাকে। এর ফলে মাকড়সাটার মৃত্যু হয় না বটে, কিন্তু একেবারে অসাড়ভাবে পড়ে থাকে। তখন কুমোরে-পোকা অসাড় মাকড়সাকে মুখে করে নবনির্মিত কুঠুরির মধ্যে উপস্থিত হয়। কুঠুরির নিম্নদেশে মাকড়সাটাকে চিত করে রেখে তার উদরদেশের এক পাশে লম্বাটে ধরনের একটি ডিম পাড়ে। ডিম পেড়েই আবার নতুন শিকারের সন্ধানে বের হয়। সারাদিন অক্রান্ত পরিশ্রম করে দশ-পনেরোটা মাকড়সা সংগ্রহ করে সেই কুঠুরির মধ্যে জমা করে আবার দু-তিন ডেলা মাটি এনে কুঠুরির মুখ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয়। তারপর দু-এক দিনের মধ্যেই পূর্বোক্ত কুঠুরির গায়েই আর একটি কুঠুরি নির্মাণ শুরু করে। সেই কুঠুরিটিও মাকড়সা পূর্ণ করে তাতে ডিম পেড়ে মুখ বন্ধ করবার পর তৃতীয় কুঠুরি নির্মাণ করতে আরম্ভ করে। এরূপে এক একটি বাসার মধ্যে চার-পাঁচটি কুঠুরি নির্মিত হয়। ডিম পাড়া সম্পূর্ণ হয়ে গেলে সে তার ইচ্ছামতো যেকোনো স্থানে চলে যায়, বাসার আর কোনো খোঁজ-খবর নেয় না। বাচ্চাদের জন্যে খাদ্য সঞ্চিত রেখেই সে খালাস।
লেখক পরিচিতি : গোপালচন্দর ভট্টাচার্য (১৮৯৫-১৯৮২) : প্রকৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের সুত্রে তাঁর রচনার মূল উপাদান প্রকৃতি ও প্রাণীজগৎ। জীবজগতের খুঁটিনাটি তথ্য সহজ ভাব ও সরল ভাষায় তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন। লেখক গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের অনুসন্ধিৎসা এবং পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা তাঁর বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধগুলিকে বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদে পরিণত করেছে। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান বিষয়ক রচনার জন্য তিনি রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়েছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হলো – বাংলার মাকড়সা, বাংলার কীটপতঙ্গ ইত্যাদি।
∆ বিষয়বস্তু / সারাংশ—
এই রচনায় কুমোরে-পোকার বাসা বানানো, শিকার ধরা ও ডিম পাড়ার বিস্ময়কর স্বভাব বর্ণনা করা হয়েছে। কুমোরে-পোকা কালো রঙের এক ধরনের পোকা, যার শরীরের মাঝখানে হলদে সরু অংশ থাকে। ডিম পাড়ার সময় হলে সে উপযুক্ত স্থান খুঁজে নিয়ে কাদামাটি দিয়ে ছোট ছোট কুঠুরি তৈরি করে বাসা বানায়। প্রয়োজনে কাছাকাছি না পেলে অনেক দূর থেকেও ভিজে মাটি সংগ্রহ করে আনে।
প্রতিটি কুঠুরি বানাতে তার প্রায় দু-দিন সময় লাগে। কুঠুরি তৈরি হলে সে তার ভেতরে লালা দিয়ে প্রলেপ দেয় এবং তারপর শিকারের খোঁজে বের হয়। কুমোরে-পোকা বিভিন্ন ছোট মাকড়সা ধরে, তাদের হুল ফুটিয়ে অচেতন করে কুঠুরির ভিতরে জমা করে। এরপর সেই মাকড়সার উপর একটি ডিম পাড়ে এবং কুঠুরির মুখ বন্ধ করে দেয়।
এভাবে একটির পর একটি কুঠুরি তৈরি করে তাতে ডিম পাড়ে। একটি বাসায় সাধারণত চার-পাঁচটি কুঠুরি থাকে। ডিম পাড়া শেষ হলে কুমোরে-পোকা বাসার আর খোঁজ নেয় না। বাচ্চারা যেন জন্মের পর খাদ্য পায়, তার ব্যবস্থা করেই সে চলে যায়।
গল্পটিতে কুমোরে-পোকার পরিশ্রম, বুদ্ধি ও স্বভাবজাত প্রবৃত্তির চমৎকার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
শব্দার্থ : আনাচে-কানাচে– কোনায় কোনায়। পুনঃপুনঃ– বারবার। সংস্কারবশে– প্রচলিত ধারণা বা বিশ্বাস অনুসারে। নিয়ন্ত্রণ– আয়ত্ত, পরিচালন। অর্ধ চক্রাকার– আধখানা ঢাকার আকারবিশিষ্ট। কুঠুরি– ছোটো ঘর বা প্রকোষ্ঠ। গাঁথুনি– পরপর স্থাপিত ইট, পাথর ইত্যাদির বিন্যাস। নিঃসৃত– নির্গত। প্রলেপ– লেপন করা হয় এমন বস্তু। নিম্নদেশে– নীচের অঞ্চলে। পূর্বোক্ত– আগে বলা হয়েছে এমন। সঞ্চিত– জমিয়ে রাখা হয়েছে এমন। খালাস– মুক্তি, রেহাই।
📌 আরো দেখোঃ
📌ষষ্ঠ শ্রেণি ইউনিট টেস্ট প্রশ্নপত্র Click Here
📌ষষ্ঠ শ্রেণি বাংলা প্রশ্নোত্তর Click Here
📌ষষ্ঠ শ্রেণি ইংরেজি প্রশ্নোত্তর Click Here
📌ষষ্ঠ শ্রেণি ইতিহাস প্রশ্নোত্তর Click Here
📌ষষ্ঠ শ্রেণি ভূগোল প্রশ্নোত্তর Click Here
📌ষষ্ঠ শ্রেণি গণিত প্রশ্নোত্তর Click Here
📌ষষ্ঠ শ্রেণি বিজ্ঞান প্রশ্নোত্তর Click Here
