পশুপাখির ভাষা
—সুবিনয় রায়চৌধুরী
পশুপাখির ভাষা গল্পের বিষয়বস্তু ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলা | Posupakhir Bhasa Golper Bisoibostu Class 6 Bengali wbbse
📌ষষ্ঠ শ্রেণি ইউনিট টেস্ট প্রশ্নপত্র Click Here
📌ষষ্ঠ শ্রেণি বাংলা প্রশ্নোত্তর Click Here
∆ পাঠ্য বইয়ের গল্প—
‘পশুপাখির কি ভাষা আছে ? তারা কি মনের ভাবগুলি বিশেষ বিশেষ শব্দ দিয়ে প্রকাশ করে ? পরস্পরকে বুঝাবার জন্য তারা কি কোনো ভাষা ব্যবহার করে ?’ — এইসব প্রশ্ন মানুষের মনে বহুকাল থেকেই জেগেছে এবং এই বিষয়ে নানারকমের পরীক্ষা বহুকাল থেকে হয়ে আসছে।
পশুপাখিরা অবিশ্যি মানুষের অনেক কথারই অর্থ বোঝে। বুদ্ধিমান জীব – যেমন কুকুর, বনমানুষ, ঘোড়া প্রভৃতি — তাদের মানুষে-দেওয়া নাম শুনলেই কান খাড়া করে; – নাম ধরে ডাক দিলে কাছে আসে। মুরগিরা ‘তি-তি’ ডাক শুনে আসে, হাঁস ‘সোই-সোই’ ডাক শুনে আসে, ছাগল ‘অ-র্-র্’ ডাক শুনে আসে। হাতি তো মাহুতের কথা শুনেই চলে। মাহুতের ভাষায় (পূর্ববঙ্গের) ‘বৈঠ’ হচ্ছে ‘বস’, ‘তেরে’ মানে কাত হও, ‘ভোরি’ মানে ‘পিছনে যাও’, ‘মাইল’ মানে সাবধান ইত্যাদি। কুকুরেরাও কথা শুনে হুকুম পালন করতে ওস্তাদ; – অবিশ্যি, সে-সব কথার অর্থ তাদের শেখাতে হয়।
পশুরা মানুষের ভাষা কিছুকিছু বোঝে বটে; কিন্তু, সে ভাষা তো তারা বলতে পারে না; পরস্পরকেও সে ভাষায় বুঝিয়ে দেওয়ার কোনো উপায় জানে না তারা। তাদের মুখের কয়েকটি বিশেষ শব্দ যে তাদের মনের ভাবকে প্রকাশ করে, সেবিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। বেড়াল বা কুকুর ঝগড়া করার সময় যে শব্দ করে, কান্নার সময় সে শব্দ করে না। দূর থেকে শুনেই বোঝা যায় ঝগড়া করছে কী কাঁদছে। কুকুরের ঝগড়া আর রাগের শব্দে ‘ঘেউ’ আছে; ভয় বা কান্নার শব্দে ‘কেঁউ’ আছে। জাতভেদে শব্দের টানে আর গাম্ভীর্যে যা একটু তফাত। বেড়ালেরও তেমনি সাধারণ আওয়াজে ‘ম্যাও’, ‘মিউ’ ইত্যাদি আছে; রাগ বা ঝগড়ায় ‘ওয়াও’ আছে। দূর থেকে শব্দ শুনেই বোঝা যায় ঝগড়া করছে কী কাঁদছে। কী শুধু আওয়াজ করছে– অর্থাৎ, তোমার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছে। অনেক পশুই এই ধরনের শব্দ করে থাকে। পাখিরাও ভয়, রাগ প্রভৃতি প্রকাশ করবার জন্য বিশেষ বিশেষ শব্দ উচ্চারণ করে থাকে। বিপদের সময় পরস্পরকে জানাবার উপায়ও পশুপাখিরা বেশ জানে।
রিউবেন ক্যাস্টাং নামে একজন সাহেব বহুকাল পশুদের সঙ্গে ভাব পাতিয়ে বেড়িয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি পশুর ভাষা বেশ বুঝি। কতবার আমি জংলি হাতির সামনে পড়েছি, বাঘের গরম নিশ্বাস অনুভব করেছি, প্রকাণ্ড ভাল্লুকের থাবা মুখের সামনে দেখেছি, গরিলা প্রায় জড়িয়ে ধরে ফেলেছে আমাকে। কিন্তু একটি জিনিস প্রত্যেকবারই আমাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছে, সেটি হচ্ছে, পশুদের ভাষার জ্ঞান। আমি পশুদের ভাষা কিছুকিছু জানি বলেই এতবার সাক্ষাৎ যমকে এড়িয়ে যেতে পেরেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিংহকে যদি তারই ভাষায় বলতে পারো, তুমি তার বন্ধু, তাহলে অনেকটা নিরাপদ হবে। তারপর যদি তাদের জাতের আদবকায়দা অনুসারে তার কাছে যেতে পারো, তাহলে ভয়ের বিশেষ কোনো কারণ থাকবে না।’
ক্যাস্টাং সাহেব প্রায় চল্লিশ বছর বন্যজন্তুদের সঙ্গে থেকেছেন। খাঁচার এবং জঙ্গলের, — অর্থাৎ পোষা এবং বুনো এই দুই অবস্থার জন্তুদের সঙ্গে তাঁর আলাপ-পরিচয়ের নানা সুযোগ ঘটেছে। তাঁর বন্ধুদের মধ্যে বেশিরভাগই হচ্ছে শিম্পাঞ্জি, গরিলা, সিংহ, গ্রিজ্লি ভাল্লুক আর শ্বেত ভাল্লুক।
তিনি বলেন, ‘এইসব পশুর গলার শব্দের অবিকল নকল করার ক্ষমতা থাকায় শুধু যে বহুবার আমার প্রাণ বেঁচেছে, তা নয়; এদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাবারও অনেক সুবিধা হয়েছে। পশুরা শুধু শব্দের সাহায্যে কথা বলে না, নানারকম ইশারায়ও বলে। কুকুরের লেজনাড়া আর কান নাড়ার মধ্যে কত অর্থ আছে, তা অনেকেই আমরা জানি। একেও ভাষা বলতে হবে।’
পোষা জন্তুরা নাকি জঙ্গলের জন্তুদের থেকে অনেক বেশি চেঁচামেচি করে। পোষা কুকুর আর ঘোড়া কত চেঁচায়। কিন্তু জংলি কুকুর বা ঘোড়ার শব্দ বড়ো একটা শোনা যায় না। জঙ্গলের পশুকে সর্বদাই প্রাণ বাঁচিয়ে চলতে হয়, তাই তারা স্বভাবতই নীরব।
পশুর মধ্যে শিম্পাঞ্জি, ওরাংওটাং জাতীয় বনমানুষের ভাষা বিশেষ কিছু নাই। বানরের মধ্যে কয়েক জাতীয় বড়ো বানর ছাড়া অন্য সকলের ভাষার শব্দ অতি সামান্যই। ক্যাস্টাং সাহেব এইসব ভাষা নিয়ে বহু বৎসর গবেষণা করেছেন।
তিনি বলেন, ভালো করে লক্ষ করলে পশুদের মনের বিভিন্ন অবস্থার আওয়াজগুলি বেশ স্পষ্টভাবে ধরা যায়। এইসব আওয়াজের অবিকল নকল করতে শিখলে পশুদের সঙ্গে ভাব পাতাবারও সুবিধা হয়।
ক্যাস্টাং সাহেব বলেন, হাতি, সিংহ, বাঘ আর শ্বেত ভাল্লুকের কয়েকটির গায়ে হাত দেওয়ার আগে বিশেষ করে লক্ষ করতে হবে, তোমার আওয়াজের জবাব সে দিচ্ছে কিনা। তারপর, খুব সাবধানে, অত্যন্ত ধীরে এগিয়ে, মেজাজ বুঝে, তার গায়ে হাত দিতে হবে। বাঘের চেয়ে চিতা ঢের সহজে ভাব পাতায় আর পোষও মানে। তার মুখটি দেখলেই অনেকটা বেড়াল-বেড়াল ভাব মনে আসে।
ভাল্লুক নিরামিষাশী আর লোভী; তাকে খাবার দিলেই সে সহজে ভাব পাতায়। আমিষাশী জন্তু কিন্তু কখনও খাবারের লোভে ভাব করে না। খাবার সময় তার কারো সঙ্গে ভাব নাই; — তখন সকলকেই অবিশ্বাস।
শিম্পাঞ্জি, ওরাং এদের বিষয় কিছু লেখা হয়নি। এরা তো মানুষেরই জাতভাই; কিন্তু ভাষা এদের বড়ো একটা নাই। ভালোবাসা, সহানুভূতি প্রভৃতি এরা খুব বোঝে; ভাবও পাতায় সহজেই। এদের মনের ভাবই মুখে বেশি প্রকাশ পায়। গরিলাও এদের জাতভাই; সেও অনেকটা এদের মতো; তবে একটু কম চালাক।
শব্দার্থ:
• সাক্ষাৎ– প্রত্যক্ষ করা/দেখা হওয়া।
• আদবকায়দা– ভদ্রতার রীতিনীতি।
• নিরামিষাশী– নিরামিষ খাদ্য আহার করে যে।
• মাংসাশী– আমিষ খাদ্য আহার করে যে।
• সহানুভূতি– সমবেদনা।
• অবিশ্যি– অবশ্য
• শ্বেত– সাদা
লেখক পরিচিতিঃ
সুবিনয় রায়চৌধুরী (১৮৯০–১৯৪৫) : প্রখ্যাত সাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর পুত্র। তিনি হারমোনিয়াম, এসরাজ প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র দক্ষতার সঙ্গে বাজাতে পারতেন। সংগীতে তাঁর জ্ঞান ছিল সুবিদিত। তিনি একান্তভাবে ছোটোদের জন্যই লিখেছেন। একদিকে সহজ-সরল ভাষায় মজাদার গল্প-কবিতা যেমন লিখেছেন অজস্র, ঠিক তেমনই শিশু-কিশোর মনের জিজ্ঞাসা মেটাতে প্রাঞ্জল ভাষায় তথ্যনিষ্ঠ প্রবন্ধও রচনা করেছেন। সন্দেশ পত্রিকায় তাঁর বিপুল অবদান আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে আছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য বই সুবিনয় রায়চৌধুরীর রচনা সংগ্রহ।
বিষয় সংক্ষেপঃ আলোচ্য গদ্যাংশে লেখক পশুপাখির ভাষা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। লেখকের মতে, মানুষের মতো পশুপাখিরও নিজস্ব ভাষা আছে, তারাও আমাদের মতো বিভিন্ন অনুভূতি বা মনের ভাব প্রকাশ করতে সক্ষম। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিলে তারাও যে মানুষের সঙ্গে ভাব বিনিময়ের দ্বারা বন্ধুত্ব করতে পারে। ‘পশুপাখির ভাষা’ গদ্যাংশে তাই লেখক বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন, যেমন- মুরগিরা ‘তি-তি ডাক শুনে আসে, হাঁস ‘সোই-সোই’ ডাক শুনে আসে, ছাগল ‘অ-র্-র্’ ডাক শুনে আসে ইত্যাদি। আবার পশুদের মধ্যেও বিভিন্ন রকমের ডাক শোনা যায় তাদের অনুভূতির পার্থক্য অনুযায়ী। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় কুকুরের ঝগড়া আর রাগের শব্দে ‘ঘেউ’ এবং ভয় বা কান্নার শব্দে ‘কেঁউ’ শোনা যায়। একইরকমভাবে পাখিরাও ভয়, রাগ প্রভৃতি প্রকাশ করার জন্য বিশেষ বিশেষ শব্দ ব্যবহার করে থাকে। এই প্রসঙ্গে লেখক সুবিনয় রায়চৌধুরী রিউবেন ক্যাস্টাং নামে একজন প্রাণীবিদের কথা উল্লেখ করেছেন, যিনি প্রায় চল্লিশ বছর ধরে বিভিন্ন পশু যথা গরিলা, শিম্পাঞ্জি, জংলি কুকুর, গ্রিজলি ভালুক, শ্বেত ভালুক প্রভৃতির ভাষা নিয়ে গবেষণা করেছেন। ক্যাস্টাং সাহেব তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় দেখেছেন পশুদের ভাষা সম্পর্কে মানুষের যদি সাধারণ জ্ঞান বা ধারণা যথেষ্ট পরিষ্কার থাকে তাহলে সিংহের মতো হিংস্র পশুও মানুষের খুব ভালো বন্ধু হতে পারে। তাঁর এই বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ক্যাস্টাং সাহেব তাঁর জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। পরিশেষে লেখক সুবিনয় রায়চৌধুরী ওরাংওটাং, গরিলা, শিম্পাঞ্জি প্রভৃতি জন্তুর সঙ্গে মনুষ্য জগতের মিল ও অমিল নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করেছেন।
নামকরণঃ নামকরণ হল যে-কোনো সাহিত্যসৃষ্টির একটি প্রয়োজনীয় বিষয়। নামকরণের মধ্য দিয়ে রচনাটির বিষয়বস্তু সম্পর্কে একটি আগাম ধারণা পাওয়া যায়। ‘পশুপাখির ভাষা’ এই নামটি থেকে সহজেই বোঝা যায় যে, প্রবন্ধটিতে পশুপাখিদের ভাব বিনিময়ের মাধ্যম সম্পর্কেই আলোচনা করা হয়েছে। আলোচ্য প্রবন্ধে লেখক জানিয়েছেন পশুপাখিদের অবশ্যই নিজস্ব ভাষা আছে। ভালোভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় কুকুর, বনমানুষ, ঘোড়া প্রভৃতি জন্তুদের মানুষ যে নাম দেয়, সেই নামে ডাকলেই তারা কান খাড়া করে। মুরগি ‘তি-তি, হাঁস ‘সোই-সোই, ছাগল ‘অর্-র্’ মাহুতের কথা হাতি বুঝতে পারে। তবে এ কথাও ঠিক ভাব বিনিময়ের জন্য ওদের কোনো সহজবোধ্য ভাষা মাধ্যম নেই। অল্প কিছু শব্দ ছাড়া ওরা আকার-ইঙ্গিতেই ভাববিনিময় করে। এই প্রসঙ্গে এসেছে রিউবেন ক্যাস্টাং সাহেবের কথা। তিনি পশুদের সঙ্গে মিশেছেন, তাদের নিয়ে নানান গবেষণা করেছেন। তিনি পশুদের স্বভাব বুঝতেন ও তাদের ভাষা আয়ত্ত করতে পেরেছিলেন বলেই অনেক বিপদের হাত থেকে রক্ষাও পেয়েছেন। তিনি নানাধরনের জন্তুদের সঙ্গে ভাব জমাতে পেরেছিলেন। এই প্রবন্ধে লেখক জানিয়েছেন, পশুদের ভালোবাসলে ও সহানুভূতি দেখালে তারা সরাসরি না হলেও নানান হাবভাবে মনের কথা প্রকাশ করে। তাই প্রবন্ধটির এই নামকরণ যথাযোগ্য ও সার্থক বলা যেতে পারে।
📌 আরো দেখুনঃ
📌ষষ্ঠ শ্রেণি ইউনিট টেস্ট প্রশ্নপত্র Click Here
📌ষষ্ঠ শ্রেণি বাংলা প্রশ্নোত্তর Click Here
📌ষষ্ঠ শ্রেণি ইংরেজি প্রশ্নোত্তর Click Here
📌ষষ্ঠ শ্রেণি ইতিহাস প্রশ্নোত্তর Click Here
📌ষষ্ঠ শ্রেণি ভূগোল প্রশ্নোত্তর Click Here
📌ষষ্ঠ শ্রেণি গণিত প্রশ্নোত্তর Click Here
📌ষষ্ঠ শ্রেণি বিজ্ঞান প্রশ্নোত্তর Click Here
