পরবাসী কবিতার প্রশ্ন উত্তর অষ্টম শ্রেণি বাংলা | Porobasi Kobitar Question Answer Class 8 Bengali wbbse

পরবাসী কবিতার প্রশ্ন উত্তর অষ্টম শ্রেণি বাংলা | Porobasi Kobitar Question Answer Class 8 Bengali wbbse

পরবাসী
—বিষ্ণু দে

পরবাসী কবিতার প্রশ্ন উত্তর (বিষ্ণু দে) অষ্টম শ্রেণি বাংলা | Porobasi Kobitar Question Answer Class 8 Bengali wbbse

📌অষ্টম শ্রেণি বাংলা প্রশ্নোত্তর Click Here

📌অষ্টম শ্রেণি ইউনিট টেস্ট প্রশ্নপত্র Click Here

হাতে কলমে প্রশ্নোত্তর : পরবাসী – বিষ্ণু দে অষ্টম শ্রেণি বাংলা | Porobasi Kobitar Hate Kolome Question Answer Class 8 Bengali wbbse

১.১ কবি বিষ্ণু দে-র প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম কী ?

উত্তরঃ কবি বিষ্ণু দে-র প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’।

১.২ তাঁর লেখা দুটি প্রবন্ধের বইয়ের নাম লেখাে।

উত্তরঃ তাঁর লেখা দুটি প্রবন্ধের বইয়ের নাম— “রুচি ও প্রগতি এবং ‘সাহিত্যের ভবিষ্যৎ।

২। নিম্নরেখ শব্দগুলির বদলে অন্য শব্দ বসিয়ে অর্থপূর্ণ বাক্য তৈরি করাে (প্রথমটি করে দেওয়া হল) :

২.১ দুই দিকে বন, মাঝে ঝিকিমিকি পথ।

উত্তরঃ দুই দিকে বন, মাঝে আলােছায়া পথ।

২.২ এঁকে বেঁকে চলে প্রকৃতির তালে তালে

উত্তরঃ এঁকে বেঁকে চলে প্রকৃতির আপন খেয়ালে।

২.৩ তাঁবুর ছায়ায় নদীর সােনালি সেতারে

উত্তরঃ তাঁবুর ছায়ায় নদীর গতির ছন্দে।

২.৪ হঠাৎ পুলকে বনময়ূরের কত্থক

উত্তরঃ হঠাৎ পুলকে বনময়ূরের নৃত্যভঙ্গি।

২.৫ বন্য প্রাণের কথাকলি বেগ জাগিয়ে।

উত্তরঃ বন্য প্রাণের প্রলুব্ধ বেগ জাগিয়ে।

৩। নীচের প্রশ্নগুলির একটি বাক্যে উত্তর দাও :

৩.১ পথ কীসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে ?

উত্তরঃ কবি বিষ্ণু দে রচিত পরবাসী কবিতায় পথ বনের মধ্যে এঁকেবেঁকে প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে।

৩.২ চিতার চলে যাওয়ার ছন্দটি কেমন ?

উত্তরঃ ‘পরবাসী’ কবিতায় চিতার চলে যাওয়ার ছন্দটি লুব্ধ ও হিংস্র।

৩.৩ ময়ূর কীভাবে মারা গেছে ?

উত্তরঃ ব্যবসায়িক ও নগর পত্তনের কারণে বনজঙ্গল কেটে পরিষ্কার করার ফলে এবং চোরা শিকার হওয়ার কারণেই ময়ূর মারা গেছে।

৩.৪ প্রান্তরে কার হাহাকার শােনা যাচ্ছে ?

উত্তরঃ ‘পরবাসী’ কবিতায় ধূসর, রুক্ষ প্রান্তরে শুকনাে হাওয়ার হাহাকার শােনা যাচ্ছে।

৩.৫ পলাশের ঝােপে কবি কী দেখেছেন ?

উত্তরঃ ‘পরবাসী’ কবিতায় কবি নিটুল টিলার লাল পলাশের ঝােপে হঠাৎ পুলকে উল্লসিত ময়ূরের কত্থক নাচ দেখেছেন।

৪। নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর কয়েকটি বাক্যে লেখাে :

৪.১ জঙ্গলের কোন্ কোন্ প্রাণীর কথা কবি এই কবিতায় বলেছেন ?

উত্তরঃ ‘পরবাসী’ কবিতায় কবি আমাদের দেশের নানান প্রাণীর উল্লেখ করছেন। এই কবিতায় ছোট খরগোশ, বনময়ূর, হরিণ ও চিতার কথা বলেছেন।

৪.২ সেতারের বিশেষণ হিসেবে কবি ‘সােনালি’ শব্দের ব্যবহার করেছেন কেন ?

উত্তরঃ ‘সেতার’ হল তিন তারের সুরেলা বাদ্যযন্ত্র। কবি বিষ্ণু দে নদীর কুলকুল শব্দকে সেতারের সুন্দর আওয়াজের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সূর্যের আলোয় নদীর জল সোনালি আভায় ভরে উঠেছে। সোনালি আলোয় ভরে ওঠা নদীর নৃত্যের ছন্দ কবির কাছে সেতারের সংগীতের তাল ও ছন্দের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। একারণেই সেতারের বিশেষণে কবি ‘সােনালি’ শব্দের ব্যবহার করেছেন।

৪.৩ কত্থক ও কথাকলি-র কথা কবিতার মধ্যে কোন্ প্রসঙ্গে এসেছে ?

উত্তরঃ কত্থক হল উত্তর ভারতের অন্যতম ধ্রুপদী নৃত্যকলা। আর কথাকলি হল দক্ষিণ ভারতের কেরলের নৃত্যশৈলী। ‘পরবাসী’ কবিতায় কত্থক ও কথাকলির প্রসঙ্গ আলাদা আলাদা বন্য প্রাণীর প্রসঙ্গে কবি ব্যবহার করেছেন। ময়ূরের হঠাৎ পুলক জাগার কারণে কত্থকের মতাে নৃত্যশৈলীর কথা এসেছে। আর কথাকলির প্রসঙ্গ এসেছে চিতার লুব্ধ হিংস্র ছন্দ বােঝাতে।

৪.৪ ‘সিন্ধুমুনির হরিণ-আহ্বান’ কবি কীভাবে শুনেছেন ?

উত্তরঃ পরবাসী কবি-মন বন-জঙ্গল, প্রান্তর, টিলা– সর্বত্রই ছুটে চলেছে। চলার আবেগে কবি নদীর কলনাদ শুনতে নদীর পাড়েও গিয়েছেন। জঙ্গলাকীর্ণ নদীর কাছে গিয়ে কবি চিতার দুর্বার আবেগে লুব্ধ হিংস্র ছন্দ লক্ষ্য করেছেন। আর সেখানেই ‘সিন্ধু-মুনির হরিণ-আহ্বান’ উল্লেখের মধ্যে দিয়ে কবি রামায়ণে উল্লিখিত সিন্ধুমুনির কাহিনীটি স্মরণ করেছেন।

৪.৫ ‘ময়ূর মরেছে পণ্যে’— এই কথার অন্তর্নিহিত অর্থ কী ?

উত্তরঃ ময়ূর হল সৌন্দর্যের আধার। সে তার পেখম মেলে যখন নৃত্য করে, তখন তা সবাইকে আকৃষ্ট করে। আবার ময়ূরের সৌন্দর্যই তার এই ধ্বংসের কারণ। মানুষের ক্রমবর্ধমান সীমাহীন লোভের শিকার হয়েছে ময়ূর। সুদৃশ্য পালকের কিংবা সুস্বাদু মাংসের লোভে মানুষই তাকে নির্বিচারে হত্যা করে পণ্যের সামগ্রী করে তুলেছে অর্থাৎ, ময়ূর আজ মানুষের ব্যবসায়িক পণ্যে পরিণত হওয়ায় তার বিলুপ্তিও ঘটছে। কবি একারণে ময়ূরের অবলুপ্তি প্রসঙ্গে কথাটি বলেছেন।

৫। নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর নিজের ভাষায় লেখাে :

৫.১ বিরামচিহ্ন ব্যবহারের দিক থেকে কবিতাটির শেষ স্তবকের বিশিষ্টতা কোথায় ? এর থেকে কবিমানসিকতার কী পরিচয় পাওয়া যায় ?

উত্তরঃ বিষ্ণু দে-র ‘পরবাসী’ কবিতাটির শেষ স্তবকের চারটি বাক্যে কবি চারটি জিজ্ঞাসা চিহ্ন ব্যবহার করেছেন, যা কবিতাটিকে বিশেষ মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।

কবিতার শেষ স্তবকে কবি যে প্রশ্নগুলি তুলেছেন তার মধ্য দিয়ে ঝরে পড়েছে তার মনের একরাশ আক্ষেপ আর হতাশা। কবি অবাক হয়ে ভেবেছেন একদল মানুষ নির্বিচারে প্রকৃতিকে লুট করে চলেছে। কবি যেন তির্যক, তীক্ষ্ণ প্রশ্নের কশাঘাতে মানুষের, বিশেষত ব্যাবসাজীবী, মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছেন। সভ্যতার আগ্রাসনে পৃথিবীর নদী, পাহাড়, গাছ লুপ্ত হচ্ছে। বনবাসী প্রাণীরা হারিয়ে যেতে বসেছে। নিজের দেশেই মানুষ উদ্বাস্তুর মতাে ঘুরে বেড়াতে বাধ্য হয়েছে। তারা স্থায়ী স্বাভাবিক, চিরপ্রত্যাশিত নিজস্ব বাসস্থান গড়ে তুলতে পারে না। এদেশের সাধারণ মানুষ এর প্রতিবাদ না করে কেন এমন অসহায় ভাবে নীরব হয়ে আছে! নিজের দেশের নদী গাছ পাহাড়ের এই ও মর্যাদা কি করে সহ্য করছে তারা ? এইসব মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে কবি প্রশ্নগুলো তুলে ধরেছেন।

৫.২ কবি নিজেকে পরবাসী বলেছেন কেন ?

উত্তরঃ প্রকৃতি ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে দিয়েই সভ্যতা টিকে আছে। কিন্তু পরবাসী’ কবিতায় কবি সৌন্দর্যময় বিশ্বপ্রকৃতির শ্বাশ্বত রূপের সঙ্গে স্বার্থপর মানুষের নির্লজ্জ অমানবিকতার ছবি তুলে ধরেছেন। এই বৈপরীত্য, এক অর্থে বিপর্যয়। প্রথম স্তবকে কবি দেখেছেন, প্রকৃতির স্বচ্ছন্দ্য বৈচিত্র্য। বাঁকা পথ, দুধারে বন, কচিকচি খরগােশ, পলাশের ঝােপ, উৎফুলিত বনময়ূরের কথক ভঙ্গি, নদীর জল, চুপিসারে হরিণের জল খাওয়া, কিংবা হিংস্র-ছন্দে বন্য চিতার যাতায়াত সব কিছুই যেন প্রকৃতির ক্যানভাসে এক একটি জীবন্ত ছবি। এটাই তাে কবির প্রিয় দেশ। কিন্তু চতুর্থ স্তবক থেকে কবির কণ্ঠে শােনা গিয়েছে, আশাহীণতার বাণী। গ্রামের অপমৃত্যু, ময়ূরের পণ্যে পরিণত হওয়া, হাওয়াও যেন হাহাকার রবে বয়ে যায়। কবির কাছে তাঁর প্রিয় দেশের এই পরিণতি সহ্য করা ছিল অসহ্য। আবেগহীন, ভালােবাসাহীন এই দেশকে কবি নিজের দেশ বলে আর ভাবতে পারছিলেন না। আর এই মানসিক তথা সামাজিক বিপর্যয়গ্রস্ত সমাজে কবি সৌন্দর্যময় বিশ্ব প্রকৃতির চিরকালীন রূপের সন্ধান পান না বলেই নিজভূমে নিজেকে ‘পরবাসী’ বলেছেন।

৫.৩ “জঙ্গল সাফ, গ্রাম মরে গেছে, শহরের / পত্তন নেই…”– প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে এই পঙক্তিটির প্রাসঙ্গিকতা বিচার করাে।

উত্তরঃ আলােচ্য উদ্ধৃতাংশটি বিষ্ণু দে-র লেখা ‘পরবাসী কবিতার থেকে গৃহীত হয়েছে।

প্রকৃতি ও মানুষ একে অপরের অভিন্ন অংশ। পারস্পরিক সহচার্যে তারা প্রকৃতিকে সুন্দর করে তুলেছে। কিন্তু কবি বিষ্ণু দে প্রতিদিন প্রকৃতিকে একটু একটু করে ধ্বংস হতে দেখছেন। মানুষের অতিরিক্ত লােভই এর জন্য দায়ী। অরণ্য ধ্বংস হয়েছে। গ্রাম নষ্ট করে নগর তৈরি হলেও আদর্শ শহর গড়ে ওঠেনি, যেখানে সকলের স্থান হয়। পৃথিবীর আবহাওয়া ক্রমাগত বিষাক্ত হয়ে উঠছে। সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে মানুষ বন্যপ্রাণীদের পণ্যে পরিণত করেছে। গ্রাম শহর নগর বিকশিত হওয়ার বদলে সভ্যতার আগ্রাসনে নদী, পাহাড়, গাছ লুপ্ত হয়ে পৃথিবীকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যা কবির হৃদয়কে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। এইভাবে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের প্রাণের সম্পর্ক বােঝাতে কবি আলােচ্য পঙক্তিটির অবতারণা করেছেন।

৫.৪ ‘পরবাসী’ কবিতার প্রথম তিনটি স্তবক ও শেষ দুটি স্তবকের মধ্যে বক্তব্য বিষয়ের কোনাে পার্থক্য থাকলে তা নিজের ভাষায় লেখাে।

উত্তরঃ কবি বিষ্ণু দে রচিত ‘পরবাসী’ কবিতাটি পাঁচটি স্তবকে বিন্যস্ত। প্রতিটি ভবকে মোট চারটি করে পঙক্তি রয়েছে। কবিতাটির প্রথম দিকের তিনটি স্তবকে কবি সৌন্দর্যময় বিশ্বপ্রকৃতির শাশ্বত অবস্থানকে ফুটিয়ে তুলেছেন। এখানে বন্য প্রাণীরা নিজেদের সহজ-স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে বেঁচে থাকে। গভীর বনভূমির মধ্যেকার আলো-অন্ধকারের পথ, রাতের আলোয় জ্বলতে থাকা বন্যজন্তুর চোখ, ছোট্ট খরগোশ, বনময়ূর, হরিণ আর চিতা অধ্যুষিত নিবিড় অরণ্য, ছন্দে বয়ে চলা নদী আজও তাঁর স্মৃতিতে জীবন্ত। সেখানে কোন বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায় না।

কিন্তু শেষ দুই স্তবকে কবি কিছু লােভী মানুষের ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থকে স্পষ্ট করেছেন। চতুর্থ স্তবকে কবি বলেছেন— “জঙ্গল সাফ, গ্রাম মরে গেছে, শহরের/ পত্তন নেই, ময়ূর মরেছে পণ্যে।” অর্থাৎ প্রকৃতি, সভ্যতা, সংস্কৃতি, সৌন্দর্যবােধ— সবই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। তবুও মানুষ সমস্ত কিছু মুখ বুজে সহ্য করে চলেছে। জীবনের আনন্দ, সৌন্দর্যকে অগ্রাহ্য করে নিজভূমে পরবাসীতে পরিণত হচ্ছে। অর্থাৎ, বর্তমান সভ্যতা ও সংস্কৃতির যে জীবনধারা ও অভিরুচি, তা আমাদের চিরাচরিত সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিরােধী বলেই তা আমাদেরকে নিজের দেশে পরবাসী করে রেখেছে। আর আমরাও আমাদের চিন্তা, চেতনা, বিবেক, বােধবুদ্ধিকে বিসর্জন দিয়ে সভ্যতার অন্ধ অনুসরণ করে চলেছি।

৫.৫ ‘পরবাসী’ কবিতাতে কবির ভাবনা কেমন করে এগিয়েছে তা কবিতার গঠন আলােচনা করে বােঝাও।

উত্তরঃ ‘পরবাসী’ কবিতায় কবি কোনাে স্থানিক পরবাসের কথা বলেননি। এই পরবাস সম্পূর্ণরূপে মানসিক চিন্তা চেতনা বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে ব্যক্তি-সমাজ জাতি কীভাবে নিজভূমে পরবাসী হয়ে উঠেছে, সেই বিষয়টিকেই কবি বিষ্ণু দে ‘পরবাসী’ কবিতায় প্রকাশ করেছেন।

‘পরবাসী’ কবিতার গঠনের দিকে লক্ষ করলে আমরা দেখতে পাই, কবিতাটি পাঁচটি স্তবক নিয়ে গঠিত এবং প্রতি স্তবক চার পঙক্তি বিশিষ্ট। কবিতাটির পাঁচটি স্তবকের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন বর্তমান। প্রথম তিনটি স্তবকে লক্ষ করা যায়, সৌন্দর্যময় বিশ্বপ্রকৃতির শাশ্বত অবস্থা আর শেষের দুটি স্তবকে ফুটে ওঠে ধ্বংস ও বিপর্যয়ের চিত্র। এই ধ্বংস বা বিপর্যয় যতখানি প্রাকৃতিক, ঠিক ততখানিক মানসিক এবং সাংস্কৃতিক। অতএব কবিতায় ব্যবহৃত স্তবকের ‘পাঁচ সংখ্যাটিও যেন আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের নিষ্ক্রিয়তা তথা বিপর্যয়কেই ব্যঞ্জিত করে তােলে। সমগ্র কবিতাটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত। মাত্রাবৃত্ত ছন্দের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল— এর লয় মধ্যম। মধ্যম লয়ের এই ভাবটিই যেন ব্যক্তি-সমাজ-জাতির মাধ্যমে শ্রেণিসত্তা বা মানসিকতাকে ইঙ্গিতপূর্ণ করে তােলে। তাই পঞম স্তবক জুড়ে শুধুই প্রশ্নবাণ ধেয়ে আসে শ্লেষের ধাঁচে—“কেন এই দেশে মানুষ মৌন অসহায় ? কেন নদী গাছ পাহাড় এমন গৌণ ?/ সারাদেশময় তাঁবু বয়ে কত ঘুরব ?/ পরবাসী কবে নিজ বাসভূমি গড়বে ?”

আবার তৃতীয় স্তবকে দেখি, পৌরাণিক প্রসঙ্গের ব্যবহার—“শুনেছি সিন্ধুমুনির হরিণ আহ্বান।” কিন্তু পরের পঙক্তিতেই সেই সৌন্দর্য বদলে যায়। “চিতা চলে গেল লুদ্ধ হিংস্র ছন্দে”— এই চিত্রকল্প যেন হিংস্র নাগরিক মানসিকতাকেই তুলে ধরে। অর্থাৎ, কবি এই বিপর্যস্ত, ধ্বংসপ্রাপ্ত সমাজে সৌন্দর্যময় বিশ্বপ্রকৃতির শাশ্বত রূপ উপলদ্ধি করতে পারেন না বলেই নিজভূমে নিজেকে ‘পরবাসী বলেছেন, যে ভাবনা কবিতাটির গঠনের মধ্যে দিয়ে সার্থকভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

৫.৬ কবিতাটির নাম ‘পরবাসী’ দেওয়ার ক্ষেত্রে কবির কী কী চিন্তা কাজ করেছে বলে তােমার মনে হয় ? তুমি কবিতাটির বিকল্প নাম দাও এবং সে- নামকরণের সপক্ষে তােমার যুক্তি সাজাও।

উত্তরঃ কবিতাটির নাম ‘পরবাসী’ দেওয়ার ক্ষেত্রে কবি দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা ভেবেছেন। এই সৌন্দর্য কেবলমাত্র আকাশ, নদী, পাহাড়, বন, মাঠ নিয়ে নয়— জীবজন্তু নিয়েও। একই সঙ্গে ব্যক্তি মানুষের ভিতরকার ধ্বংসাত্মক, লােভী, পীড়নকারী মানসিকতার কথাও আছে। দেশের সাধারণ মানুষ, যারা গ্রামাঞ্চলে বাস করে, তারা এই সহজ নৃত্যছন্দময় খরগােশ কিংবা বন-ময়ূরের মতাে।

অন্যদিকে নাগরিক শহুরে জীবনে অভ্যস্ত ব্যবসায়ী মানুষ গ্রাম-বন-জঙ্গল সাফ করে যে-নগর গড়ে তােলে, সেখানে আদি মানুষগুলি স্থান পায় না। তারা আবার নতুন গ্রাম গড়ে তােলে। লােভীরা আবার সেখানে থাবা বসায়। এভাবে মানুষগুলি চিরকাল নিজদেশে পরবাসী হয়েই থেকে যায়। কবি দেশের এই বনভূমি, বন্যপ্রাণী ও গ্রাম্য পরিবেশ ধ্বংস করা ও তার পরিবর্তে নগর সভ্যতা গড়ে তােলার কারণে সাধারণ মানুষের বারবার গৃহহীন হওয়ার কথাই চিন্তা করেছেন বলে আমার মনে হয়।

» আমি কবিতাটির বিকল্প নাম হিসেবে ‘অনধিকার’ শিরােনামটি দিতে পারি। কবিতার মূল বিষয় হল— বন্যপ্রাণীরা বনের অধিকার পাচ্ছে না। মানুষের লােভী ইচ্ছা সেখানে থাবা বসাচ্ছে। মানুষেরই ঘৃণ্য চক্রান্তে, চরম নিষ্ঠুরতায় গাছপালা হারিয়ে যাচ্ছে। কিছু মানুষের সর্বগ্রাসী থাবায় গ্রাম ও গ্রামের মানুষজন আর পাঁচটা জিনিসের মতাে পণ্য হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। দেশের সিংহভাগ মানুষই তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। দেশের কোনাে সম্পদের ওপরই তাদের যেন কোনাে অধিকার নেই। এই কারণে আমি ‘অনধিকার’ নামটিকেও কবিতার উপযুক্ত বলে মনে করি।

৬। টীকা লেখাে : কথক, সেতার, কথাকলি, সিন্ধুমুনি, পণ্য।

উত্তরঃ

কত্থক: একটি বিশেষ ধরনের শাস্ত্রীয় নৃত্য পদ্ধতি। উত্তর ভারতের অন্যতম ধ্রুপদী নৃত্য কলা হল কত্থক এবং লক্ষ্ণৌ ও জয়পুরকেই এই নৃত্যের জন্মস্থান বলে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। কত্থক প্রধানত নৃত্য, মুদ্রার ব্যবহার খুবই কম। সূক্ষ্ম তীব্র পায়ের কাজই এই নাচের প্রাণ। এই কবিতায় কবি কত্থক নাচের উপমাটি ব্যবহার করেছেন।

সেতার : তিনটি তারযুক্ত বাদ্যযন্ত্র বিশেষ। সেতার যন্ত্রটির গােড়ার দিক গােলাকৃতি ও ফাঁপা। একে তুম্বা বলে। এর আরও কয়েকটি অঙ্গ আছে। সেতারের অঙ্গগুলির নাম— দণ্ড, পটরি, গুল, তবলি, ব্রিজ, ঘােরী, খুঁটি, পর্দা ইত্যাদি। সেতারের কিছু নিজস্ব পরিভাষা আছে। সেগুলি হল— প্রহার, ঠাট, গিটকরী, খটকা ইত্যাদি। ভারতবর্ষের কয়েকজন বিখ্যাত সেতার বাদক হলেন— ওস্তাদ বিলায়েৎ খাঁ, পণ্ডিত রবিশংকর প্রমুখ। এই কবিতায় নদীর কুল কুল জল ধনী প্রসঙ্গে কবি উপমাটি ব্যবহার করেছেন।

কথাকলি : কথাকলি একটি দক্ষিণ ভারতের শাস্ত্রীয় নৃত্য পদ্ধতি। এই নাচে যে-অঙ্গসজ্জার ব্যবহার করা হয়, তা দ্রাবিড় সভ্যতাজাত লােকনৃত্যধর্মিতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই নৃত্যে মুখের সজ্জায় খুব জোর দেওয়া হয়। চরিত্র অনুযায়ী নানা রং দিয়ে মুখে প্রায় মুখােশের মতাে মেক-আপ করা হয়। ভ্রূ, চোখ ও ঠোঁট গাঢ় করে আঁকা হয়। নানা রঙের দাড়িও ব্যবহার করা হয়। নারী চরিত্রের মাথায় একখণ্ড কাপড় থাকে। এই নাচ মূলত কেরলের ধ্রুপদি নৃত্যশৈলী। এই কবিতায় চিতাবাঘের হিংস্র দৌড় প্রসঙ্গে উপমাটি ব্যবহৃত হয়েছে।

সিন্ধুমুনি : অন্ধমুনি ও শূদ্রা’র পুত্র হলেন সিন্ধুমুনি। ইনি সরযু নদীর তীরে বাস করতেন। তিনি সবসময় পিতা-মাতার সেবা করতেন। একদিন জঙ্গলে গাছের নীচে বাবা-মাকে বসিয়ে তিনি তাদের জন্য নদীতে জল আনতে যান। এইসময় অযােধ্যার রাজা দশরথ ওই বনে শিকার করছিলেন। সিন্ধুমুনির জল ভরার শব্দকে রাজা হরিণের জলপানের শব্দ মনে করেন এবং তৎক্ষণাৎ শব্দভেদী বাণ নিক্ষেপ করেন। এই শব্দভেদী বাণের আঘাতে সিন্ধুমুনির মৃত্যু হয়। দশরথ অন্ধমুনিকে খবর দিলে তারাও সঙ্গে সঙ্গে পুত্রশােকে দেহত্যাগ করেন। রামায়ণের অযোধ্যাকাণ্ডে এই কাহিনী বর্ণিত আছে। কবিতায় হরিণ আহ্বান প্রসঙ্গে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।

পণ্য : ‘পণ্য’ শব্দটির অর্থ-বিক্রয়যােগ্য দ্রব্যাদি। বর্তমান যুগে পণ্য’ কথাটি বহুল প্রচারিত ও ভিন্নার্থে এর তাৎপর্যপূর্ণ প্রয়ােগ দেখা যায়। শিল্প-বিপ্লবের পরবর্তী যুগে পণ্যদ্রব্যের প্রাচুর্য বেড়েছে। বিজ্ঞানের সর্ববিস্তারী প্রসারের ফলে বাজারে দিন দিন পণ্যসামগ্রীর চাহিদা বাড়ছে। মানুষের লােভ আজ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে। যে, এখন মানুষকেও মুনাফা অর্জনের পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

৭। নীচের শব্দগুলির ধ্বনিতাত্ত্বিক বিচার করাে : জ্বলে, পরবাসী, চলে, তাঁবু।

» জ্বলে = জ্বলিয়া > জ্বইল্যা > জ্বলে— অভিশ্রুতি।

» পরবাসী = প্রবাসী > পরবাসী মধ্য স্বরাগম / স্বরভক্তি / বিপ্রকর্ষ ।

» চলে = চলিয়া > চইল্যা > চলে— অভিশ্রুতি।

» তাঁবু = তম্বু > তাঁবু— নাসিক্যীভবন।

৮। ব্যাসবাক্য-সহ সমাস নির্ণয় করাে : নিটোল, বনময়ূর, সিমুনি, নিজবাসভূমি, সেতার।

» নিটোল = নেই টোল যার— না-বহুব্রীহি।

» বনময়ূর = বনে থাকে যে ময়ূর— মধ্যপদলােপী কর্মধারয়।

» সিন্ধুমুনি = সিন্ধু নামধারী মুনি— মধ্যপদলােপী কর্মধারয়।

» নিজবাসভূমি = নিজের বাসভূমি— সম্বন্ধ তৎপুরুষ সমাস।

» সেতার = সে (তিন) তার যার— সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি সমাস।

৯। নীচের শব্দগুলি কীভাবে গঠিত হয়েছে দেখাও : সােনালি, আহ্বান, বন্য, বসতি, পরবাসী।

সােনালি = সােনা + আলি। আহ্বান = আ – হ্বে + অন। বন্য = বন + য। বসতি = বস + অতি। পরবাসী = পরবাস + ঈ।

১০। নির্দেশ অনুসারে বাক্য পরিবর্তন করাে :

১০.১ চুপি চুপি আসে নদীর কিনারে, জল খায়। (সরল বাক্যে)

উত্তরঃ চুপি চুপি নদীর কিনারে এসে জল খায়।

১০.২ নিটোল টিলার পলাশের ঝােপে দেখেছি। (জটিল বাক্যে)

উত্তরঃ যেখানে নিটোল টিলা সেখানে পলাশের ঝোপে দেখেছি।

১০.৩ চিতা চলে গেল লুদ্ধ হিংস্র ছন্দে বন্য প্রাণের কথাকলি বেগ জাগিয়ে। (যৌগিক বাক্যে)

উত্তরঃ চিতা চলে গেল লুদ্ধ হিংস্র ছন্দে এবং সেই ছন্দে বন্য প্রাণের কথাকলি বেগ জেগে উঠল।

১০.৪ কেন এই দেশে মানুষ মৌন অসহায় ? (না-সূচক বাক্যে)

উত্তরঃ এই দেশে মানুষ মৌন অসহায় হওয়ার কোন কারণ জানি না।

অতিরিক্ত প্রশ্নোত্তর : পরবাসী – বিষ্ণু দে অষ্টম শ্রেণি বাংলা | Porobasi Kobitar Hate Kolome Question Answer Class 8 Bengali wbbse

1. সঠিক উত্তরটি খুঁজে নিয়ে লেখ।

(i) পরবাসী কবিতার কবির নাম (কাজী নজরুল / বিষ্ণু দে / মাইকেল মধুসূদন)।

উত্তরঃ বিষ্ণু দে

(ii) কবি বিষ্ণু দে’র প্রথম কাব্য গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় (2012 / 1946 / 1932) সালে।

উত্তরঃ 1932

(iii) কবি বিষ্ণু দের একটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ হল – (চোরাবালি / ধূসর পৃথিবী / খেয়া)।

উত্তরঃ চোরাবালি।

(iv) ঝিকিমিকি পথ কোথায় দেখা যায় ? (বনের মাঝখানে / ফুলের বাগানে / রামধনু রঙে)।

উত্তরঃ বনের মাঝখানে।

(v) যে নৃত্য শৈলীর সঙ্গে কবি বর্ণনা করেছেন – ( বিহু / কত্থক / কথাকলি )।

উত্তরঃ কত্থক ।

(vi) রাতের আলোয় থেকে থেকে জ্বলে – (আগুন / হ্যারিকেন / চোখ)।

উত্তরঃ চোখ।

(vii) নিচে লাফ দেয় কচি কচি (বিড়াল/ খরগোশ / ছাগল)।

উত্তরঃ খরগোশ

(viii) কবি পলাশের ঝোপে দেখেছেন (খরগোশের / হরিণের / ময়ূরের) নাচ।

উত্তরঃ ময়ূরের।

(ix) চুপি চুপি নদীর কিনারে এসেছিল – (বাঘ / হরিণ / সিন্ধুমুনি)।

উত্তরঃ সিন্ধুমুনি।

(x) বন্যপ্রাণীর কথাকলি বেগ জাগিয়ে যায় – ( চিতা / বাঘ / হরিণ )।

উত্তরঃ চিতা।

(xi) ময়ূর মরেছে – (বাঘের আক্রমণের কারণে / মানুষের লোভের কারণে / কোনোটিই নয় )

উত্তরঃ মানুষের লোভের কারণে।

(xii) পরবাসী কবিতা পরবাসী কে ? (কবির পিতা মাতা / কবি স্বয়ং / কবির প্রিয়জন )।

উত্তরঃ কবি স্বয়ং।

প্রথম ইউনিট টেস্ট বাংলা প্রশ্নোত্তর

বোঝাপড়া কবিতার প্রশ্নোত্তর

অদ্ভুত আতিথেয়তা প্রশ্নোত্তর

চন্দ্রগুপ্ত নাটকের প্রশ্নোত্তর

বনভোজনের ব্যাপার প্রশ্নোত্তর

সবুজ জামা কবিতার প্রশ্নোত্তর

চিঠি গল্পের প্রশ্নোত্তর

পরবাসী কবিতার প্রশ্নোত্তর

পথ চলতি‌ গল্পের প্রশ্নোত্তর

একটি চড়ুই পাখি প্রশ্নোত্তর

ছোটদের পথের পাঁচালী (১–৮)

ভাষাচর্চা প্রথম অধ্যায় প্রশ্নোত্তর

ভাষাচর্চা দ্বিতীয় অধ্যায় প্রশ্নোত্তর

ভাষাচর্চা নির্মিতি প্রথম অধ্যায়

📌 আরো দেখোঃ

📌অষ্টম শ্রেণি বাংলা প্রশ্নোত্তর Click Here

📌অষ্টম শ্রেণি ইউনিট টেস্ট প্রশ্নপত্র Click Here

📌 অন্যান্য বিষয়ের প্রশ্নোত্তরঃ

📌 অষ্টম শ্রেণি ইংরেজি প্রশ্নোত্তর Click Here

📌 অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস প্রশ্নোত্তর Click Here

📌 অষ্টম শ্রেণি ভূগোল প্রশ্নোত্তর Click Here

📌 অন্যান্য ক্লাসের বাংলা প্রশ্নোত্তরঃ

📌পঞ্চম শ্রেণি বাংলা প্রশ্নোত্তর Click Here

📌 ষষ্ঠ শ্রেণি বাংলা প্রশ্নোত্তর Click Here

📌 অষ্টম শ্রেণি বাংলা প্রশ্নোত্তর Click Here

📌 নবম শ্রেণি বাংলা প্রশ্নোত্তর Click Here

📌 দশম শ্রেণি বাংলা প্রশ্নোত্তর Click Here

WhatsApp Group Join Now
Telegram Group Join Now

Leave a Reply